বিশেষ প্রতিবেদক, সাতক্ষীরাঃ১৬ অক্টোবর ২০২৬ 
পারিবারিক মান-অভিমানের রেশ ধরে স্ত্রীর সাথে কথাকাটাকাটি হয়েছিল। গোপনে ধারণ করা সেই ব্যক্তিগত কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে দেওয়া হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভে উসকানি দিয়ে জড়ো করা হলো শত শত মানুষ। দফায় দফায় গণপিটুনির পর পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে।
চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায়। নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে 'কামিল' পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন; পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিতেও ডিগ্রি নেন। অথচ এমন একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষকে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে বর্বরোচিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, যার নেপথ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক সাবেক ইমাম ও পার্টটাইম কসাই হিসেবে পরিচিত ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওয়াহিদুজ্জামান শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন ছিলেন। কখনো তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকতেন, আবার কখনো মানসিক অস্থিরতায় অসংলগ্ন আচরণ করতেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় স্ত্রীর সাথে তাঁর একটি পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে। রাগের মাথায় কথোপকথনের কিছু অংশ কেউ গোপনে রেকর্ড করে।
সেই অডিও ক্লিপকে 'ধর্মবিরোধী' আখ্যা দিয়ে পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে আসেন। লাইভে তিনি শামীমের বাড়ির ঠিকানা প্রকাশ করে লোকজনকে উসকে দেন এবং বিচারের নামে জড়ো হওয়ার ডাক দেন। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সুবর্ণাবাদ বাজারে শামীমকে প্রথম দফায় মারধর করা হয়। তীব্র অপমান ও মানসিক আঘাতে শামীম বাড়ি ফিরে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।
বিষপানে অসুস্থ হয়ে পড়লে শামীমকে কুলিয়া এলাকার এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে ফজলুল হক আমিনী আবারও ফেসবুকে লাইভ করে ওই চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে জনতাকে জড়ো হতে বলেন। কয়েকশ মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে চিকিৎসাধীন শামীমকে বাইরে বের করে দ্বিতীয় দফায় মারধর করে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু উন্মত্ত জনতার হিংস্রতা সেখানেও থামেনি। রাতে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে একদল লোক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চড়াও হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অসহায় করে দিয়ে হাসপাতালের ভেতর থেকে শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করা হয় এবং নির্মমভাবে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর হত্যাকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করে পোস্টও দেয়।
নিহতের পরিবারের প্রশ্ন, শামীম যদি কোনো অপরাধ করেও থাকেন, তবে দেশে তো আইন ও আদালত রয়েছে। একজন কামিল ও মাস্টার্স পাস ব্যক্তি, যিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত কথোপকথন পুঁজি করে এভাবে প্রকাশ্যে ‘মব’ তৈরি করে হত্যা করা কোন ধর্মের শিক্ষা?
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং উগ্র ধর্মান্ধতা, ফেসবুকের অ্যালগরিদম নির্ভর গুজব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নারকীয় বহিঃপ্রকাশ। একজন সাবেক ইমাম ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি যখন ধর্মের ঠিকাদার সেজে ফেসবুক লাইভে ‘মব লিনচিং’ বা গণপিটুনির ডাক দেয় এবং শত শত মানুষ কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই তাতে অংশ নেয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমাজ কতটা যুক্তিহীন ও অসহনশীল হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের মতো জরুরি সেবাকেন্দ্রে পুলিশি সুরক্ষায় থাকা একজন ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর বড় এক চপেটাঘাত। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০০–২৫০ জনের বিরুদ্ধে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তবে মূল অভিযুক্ত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের দাবি, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিদাতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত ও কঠোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না হলে এমন ‘মব কালচার’ সমাজে আরও বহু নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে।