
আইনজীবীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি কি ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাধা?
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১৫ মে ২০২৬
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরন, বদলাচ্ছে প্রমাণের প্রকৃতি। একসময় যেখানে কাগজের দলিল, সাক্ষী আর জবানবন্দিই ছিল মামলার প্রধান ভিত্তি, সেখানে আজ ডিজিটাল প্রমাণ—ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা আইপি অ্যাড্রেসের মেটাডেটা—নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন মানুষের ভাগ্য। ফলে বিচারব্যবস্থাও বাধ্য হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর এই বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে।
ডিজিটাল প্রমাণ: আইনের নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশে ২০২২ সালের সংশোধিত সাক্ষ্য আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রমাণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাক্ষ্য আইনের ৬৫খ ধারা (Section 65B equivalent) অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক রেকর্ড আদালতে উপস্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং টেকনিক্যাল সার্টিফিকেট আবশ্যক করা হয়েছে। এর ফলে একটি ইমেইল বা ডিজিটাল ফাইলও যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হলে তা শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই আইনি কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর?
প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা: ন্যায়বিচারের অন্তরায়?
দেশের অধিকাংশ আইনজীবী এখনো ডিজিটাল ফরেনসিক, মেটাডেটা বিশ্লেষণ বা সাইবার প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, শক্তিশালী ডিজিটাল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না বা প্রতিপক্ষের টেকনিক্যাল যুক্তির সামনে ভেঙে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
“বর্তমান সময়ে একজন আইনজীবীর শুধু আইন জানলেই হবে না, তাকে প্রযুক্তির ভাষাও বুঝতে হবে।”
ভুল প্রমাণের ফাঁদে নির্দোষ মানুষ
ডিজিটাল প্রমাণ যেমন অপরাধীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে, তেমনি ভুল বিশ্লেষণ বা জালিয়াতির কারণে নির্দোষ মানুষও ফেঁসে যেতে পারেন।
হ্যাকড ইমেইল, ক্লোনড আইপি অ্যাড্রেস, এমনকি ডিপফেক ভিডিও—এসব এখন বাস্তব ঝুঁকি।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—
সিসিটিভি ফুটেজে অবয়ব মিললেও ব্যক্তি ভিন্ন
অন্য কেউ ডিভাইস ব্যবহার করে অপরাধ করেছে
আইপি ট্র্যাকিং বিভ্রান্তিকর হয়েছে
এই পরিস্থিতিতে সঠিক ফরেনসিক বিশ্লেষণই একমাত্র ভরসা।
আদালতে প্রথাগত মানসিকতার বাধা
এখনো দেশের অনেক আদালতে ডিজিটাল প্রমাণকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
“কম্পিউটার ফাইল কি কাগজের মতো নির্ভরযোগ্য?”—এ ধরনের প্রশ্ন বাস্তবেই উঠছে।
তবে বিচারিক দৃষ্টান্তে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। Malek Sarwar v. State (2020) মামলায় আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা যাবে না এবং ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে আদালতকে প্রগতিশীল হতে হবে।
৬৫খ ধারার বাস্তব জটিলতা
আইনের দৃষ্টিতে সুরক্ষিত হলেও বাস্তবে ৬৫খ ধারার সার্টিফিকেট সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সমস্যাগুলো হলো—
পর্যাপ্ত আইটি বিশেষজ্ঞের অভাব
সরকারি অনুমোদিত সার্টিফায়ারের সীমাবদ্ধতা
সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধি
ফলে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণও আদালতে উপস্থাপনের আগেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
ফরেনসিক ল্যাবের সংকট
বাংলাদেশে সিআইডি ও পিবিআই-এর ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব থাকলেও মামলার তুলনায় সক্ষমতা সীমিত। একটি রিপোর্ট পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, যা বিচারপ্রার্থীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ।
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব—
জেলা পর্যায়ে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন
বেসরকারি ফরেনসিক অডিট প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন
দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ
নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের সুযোগ
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তরুণ আইনজীবীদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
ডিজিটাল আইন, সাইবার ক্রাইম ও ফরেনসিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলে তারা দ্রুতই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে—
প্রথাগত সিনিয়রদের সাথে সমন্বয়
প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের অভাব
আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
ডিজিটাল নিরাপত্তা: ব্যক্তিগত দায়
প্রশ্ন উঠছে—
যদি কারও ডিভাইস হ্যাক হয়ে অপরাধ সংঘটিত হয়, দায় কার?
আইনগতভাবে এটি জটিল বিষয়। তবে প্রমাণ করতে হবে—
ডিভাইস অননুমোদিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে
ফরেনসিকভাবে আইপি ও লগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে
অভিযুক্তের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নেই
অতএব, ব্যক্তিগত ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন আইনি সুরক্ষার অংশ।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে। আইনগত কাঠামো তৈরি হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানসিকতার পরিবর্তন—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া ডিজিটাল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্তমান বাস্তবতায় এই রূপান্তরকে ১০-এর মধ্যে ৬ বা ৭ দেওয়া যেতে পারে। কারণ, আইন আছে—কিন্তু প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে গেছে।
প্রযুক্তি এখন শুধু সুবিধা নয়, এটি ন্যায়বিচারের হাতিয়ার। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি যেমন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, তেমনি নির্দোষ মানুষকেও অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।