শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন
Title :
শর্টকাট পথে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা নিয়ে দক্ষ আইনজীবী হওয়া অসম্ভব: আইনমন্ত্রী আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংকট: আইনি সীমানা, আদালত অবমাননা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়ায় নতুন কড়াকড়ি: বাধ্যতামূলক হলো ‘ভিসা অঙ্গীকারনামা’ সি ক্রিস্টিন ফেয়ারের মন্তব্য ও আলী রিয়াজের একাডেমিক সংযোগ: ভূ-রাজনীতি, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক প্রভাব একই মামলায় তথ্য গোপন করে ৩ বার আগাম জামিন: দুই আইনজীবীকে তলব করলেন হাইকোর্ট বিচার বিভাগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম: একটি মহাকাব্যের অবসান নাকি নতুন সংকটের শুরু? অসময়ে উঁকি দিচ্ছে রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘা: পঞ্চগড়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড় ঢাকার আদালতকে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করতে হাইকোর্টে রিট। জরুরি প্রস্তুতিতে খাবার-পানি মজুদের হিড়িক: আসন্ন কোনো বিপর্যয়, নাকি বৈশ্বিক আত্মরক্ষার আগাম কৌশল শৃঙ্খল ভেঙে সাফল্যের শিখরে ব্যারিস্টার আঞ্জুমান আরা লিমার হার না মানা জীবনযুদ্ধ

আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংকট: আইনি সীমানা, আদালত অবমাননা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার পড়া হয়েছে

আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংকট: আইনি সীমানা, আদালত অবমাননা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা

​বিশেষ প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ৬ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকা: আদালত কেবল কোনো সাধারণ জনপরিসর নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারিক সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। ফলে আদালত প্রাঙ্গণ ও এজলাসের নিরাপত্তা এবং গাম্ভীর্য রক্ষা করা বিচার ব্যবস্থার একটি অলঙ্ঘনীয় পূর্বশর্ত। তবে সম্প্রতি ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালত চত্বরে চিত্রনায়িকা পরীমনির হাজিরাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের শক্তি প্রদর্শন, এজলাসের দ্বার রুদ্ধ করা এবং গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তা আদালত অঙ্গনের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

​ঘটনাটি বিচারিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের আচরণ কেবল ফৌজদারি অপরাধের শামিল নয়, বরং সরাসরি ‘কনটেম্পট অব কোর্ট’ বা আদালত অবমাননার স্পষ্ট লক্ষণ।

​আদালত অবমাননা ও আইনি প্রতিকার: বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

​ঘটনার আইনি তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঢাকা আদালতের অনেক  আইনজীবী জানান, আদালত প্রাঙ্গণে অনধিকার প্রবেশ ঘটিয়ে বলপ্রয়োগ করা বা এজলাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা সুস্পষ্টভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি আঘাত।

​আইনজীবীদের মত অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটিকে দুটি প্রধান আইনি দিক থেকে বিবেচনা করা যায়:

  1. ​ফৌজদারি অপরাধ ও ব্যক্তিগত আঘাত: আদালত চত্বরে কর্তব্যরত সাংবাদিক কিংবা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ওপর শারীরিক আক্রমণের ঘটনা প্রচলিত দণ্ডবিধির আওতাভুক্ত। কারও মাথা ফাটানো বা রক্তাক্ত জখম করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারা (স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত প্রদান) এবং ৩২৫ ধারা (স্বেচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর জখম সাধন)-এর মতো ধারায় ভুক্তভোগীরা সরাসরি আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
  2. ​আদালত অবমাননা (Contempt of Court): বিচারিক এজলাসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া, বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাভাবিক বিচারিক কাজে বিঘ্ন ঘটানো এবং আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যক্তিগত শক্তি প্রদর্শন সরাসরি বিচার প্রশাসনকে অবমূল্যায়ন করার শামিল, যা আদালত অবমাননার পরিধিতে পড়ে।

​প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা বনাম ব্যক্তিগত মহড়া: দায় কার?

​আইন অনুযায়ী আদালতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা রক্ষার একক এখতিয়ার রাষ্ট্রের নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে প্রসিকিউশন বিভাগের ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতর কোনো বিচারপ্রার্থী বা আসামির ব্যক্তিগত সশস্ত্র কিংবা প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীদের মহড়া দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

​প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চোখ এড়িয়ে কীভাবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা আদালত চত্বর অতিক্রম করে এজলাস পর্যন্ত পৌঁছাল এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করল? দায়িত্বরত প্রসিকিউশন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সেখানে কার্যকর ভূমিকা কী ছিল?

​অতীতে আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো—যেমন সিএমএম চত্বর থেকে জঙ্গি ছিনতাই, এজলাসের সামনে প্রাণহানি কিংবা দাগি আসামির পলায়ন—বারবার আদালতের সংবেদনশীল নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও একজন সেলিব্রিটি বিচারপ্রার্থীর আগমনকে কেন্দ্র করে এমন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া প্রমাণ করে যে, আদালতের সার্বিক সুরক্ষা বলয়ে কাঠামোগত সমন্বয়হীনতা এখনও বিদ্যমান।

​বিচারপ্রার্থী ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয়

​আদালত কোনো প্রদর্শনী বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। বিচারক, আইনজীবী, সাধারণ বিচারপ্রার্থী এবং ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত গণমাধ্যমকর্মীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা প্রশাসনের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব।

​এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য জরুরি পদক্ষেপগুলো হলো:

  • ​নিরপেক্ষ তদন্ত: সংশ্লিষ্ট দিবসে দায়িত্বরত পুলিশ ও প্রশাসনিক সদস্যদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করা।
  • ​প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও প্রোটোকল: এজলাস এবং আদালত ভবনে যে কোনো ব্যক্তির প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর পরিচয়পত্র যাচাই এবং যে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে চত্বরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা।
  • ​শৃঙ্খলা বজায় রাখা: আদালতে হাজির হওয়া ব্যক্তি যত প্রভাবশালী বা আলোচিতই হোন না কেন, আইনের চোখে প্রত্যেকে সাধারণ বিচারপ্রার্থী—এই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।

​আদালতের পবিত্রতা, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক বিচারিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা শুধু বিচারপ্রার্থীদের অধিকার নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখারও একমাত্র উপায়।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট