

আদালত বার্তা প্রতিবেদকঃ১২ অক্টোবর ২০২৬
পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচটি করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে দাবি করা প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা বকেয়া কর আদায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া দুটি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর বেঞ্চ রিট দুটির রুল ডিসচার্জ করে রায় ঘোষণা করেছিলেন।
প্রকাশিত দুটি পূর্ণাঙ্গ রায়ের একটি ১৫ পৃষ্ঠার এবং অপরটি ৩২ পৃষ্ঠার।
৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে।
অন্যদিকে ১৫ পৃষ্ঠার রায়ের শেষাংশে গ্রামীণ কল্যাণের বকেয়া করের বিষয়ে নোটিশ জারি করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলাগুলোর মূল বিরোধ ছিল—গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ যে অর্থ পেয়েছে, সেটি লভ্যাংশ আয় (Dividend Income) হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ (Income from Other Sources) হিসেবে করযোগ্য হবে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের ওপর করদাবি নির্ধারণ করা হয়।
কর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ করবর্ষে প্রদেয় করের পরিমাণ প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা।
গ্রামীণ কল্যাণ দাবি করে আসছিল, গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির আওতায় গ্রামীণফোনে বিনিয়োগের মাধ্যমে যে আয় হয়েছে, তা লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। বিপরীতে কর কর্তৃপক্ষের অবস্থান ছিল—চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয়; ফলে সেটিকে লভ্যাংশ না ধরে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে করযোগ্য করতে হবে।
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তির ভিত্তিতে গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ওই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাওয়ার অধিকার ছিল গ্রামীণ কল্যাণের।
এই অর্থের প্রকৃতি নিয়েই পরবর্তীতে কর কর্তৃপক্ষ ও গ্রামীণ কল্যাণের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
কর কর্তৃপক্ষের মতে, সংশ্লিষ্ট অর্থকে লভ্যাংশ আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই; বরং এটি বিনিয়োগের বিপরীতে অর্জিত আয় হওয়ায় ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে করযোগ্য।
হাইকোর্টের রায়ে কর কর্তৃপক্ষের এই অবস্থানকে বেআইনি বলা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারা অধস্তন কর্তৃপক্ষ বা উপকর কমিশনারের কোনো ভুল আদেশ সংশোধনের ক্ষমতা পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারকে দিয়েছে।
এই ক্ষমতার আওতায় গ্রামীণ কল্যাণের সংশ্লিষ্ট আয় নিয়ে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে শুনানির জন্য গ্রামীণ কল্যাণকে যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। শুনানি শেষে পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার গ্রামীণ কল্যাণের দাবি করা ‘ডিভিডেন্ড ইনকাম’কে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে বিবেচনা করে কর নির্ধারণ করেন।
২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের ওই সিদ্ধান্তে কারণও উল্লেখ করা হয়েছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান।
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট আয়ের বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি এবং গ্রামীণ কল্যাণের নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, যেহেতু অর্থটি লভ্যাংশ নয়, বরং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত ‘অন্যান্য উৎসের আয়’, তাই ওই আয়ের ওপর কর নির্ধারণ আইনসঙ্গত।
হাইকোর্টও কর কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে বেআইনি মনে করেননি।
কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর গ্রামীণ কল্যাণ সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারের কাছে রিভিশন আবেদন করে।
তবে আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী স্বীকৃত করদায় পরিশোধ না করায় সেই রিভিশন আবেদনও খারিজ হয়ে যায়।
এরপর কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট দায়ের করে গ্রামীণ কল্যাণ।
মামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অন্য একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন।
তবে একই বছরের ২৯ আগস্ট ওই বেঞ্চ রায় দুটি প্রত্যাহার করে নেন।
কারণ হিসেবে উঠে আসে, বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক অতীতে একই মামলাগুলোতে সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে তাঁর ওই মামলায় বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে রায়টি ত্রুটিপূর্ণ বা ‘ডিফেকটিভ’ হওয়ার প্রশ্ন দেখা দেয়।
পরবর্তীতে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে এক আদেশে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন নতুন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। এরপর ওই বেঞ্চে মামলাগুলোর শুনানি হয় এবং ১০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ।
তিনি আদালতে যুক্তি দেন, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকম দুটি পৃথক কোম্পানি এবং কোম্পানি আইনের অধীনে তাদের পৃথক আইনগত সত্তা রয়েছে। ফলে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় ও করদায় পৃথকভাবে নির্ধারিত হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের মতে, গ্রামীণ কল্যাণ যে অর্থ পেয়েছে, তা গ্রামীণফোনের সরাসরি লভ্যাংশ নয়; বরং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির আওতায় বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ। তাই সেটিকে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে করযোগ্য করা আইনসঙ্গত।
অন্যদিকে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন ও সরদার জিন্নাত আলী শুনানি করেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য, চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ অর্থ বিনিয়োগ করে এবং গ্রামীণ টেলিকমকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর গ্রামীণফোন আগেই অগ্রিম কর কেটে নিয়েছিল।
তাঁর যুক্তি ছিল, একই আয়ের ওপর আবার গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে কর দাবি করা হলে তা দ্বৈত কর আরোপের (Double Taxation) পর্যায়ে পড়ে।
হাইকোর্টের রায়ের পরপরই রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন।
তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুলিপি পাওয়ার পর লিভ টু আপিল দায়ের করা হবে।
অর্থাৎ, হাইকোর্টের রায়ে ৬৬৬ কোটি টাকার কর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হলেও বিষয়টি এখানেই চূড়ান্তভাবে শেষ হচ্ছে না; উচ্চতর আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রামীণ কল্যাণ।
এই মামলার তাৎপর্য শুধু ৬৬৬ কোটি টাকার করদাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের প্রকৃতি কী—তা লভ্যাংশ, বিনিয়োগজনিত আয় নাকি অন্যান্য উৎসের আয়—কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার আইনগত শ্রেণিবিন্যাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ, মামলাটি তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
একই সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের পুনর্মূল্যায়ন ক্ষমতা, করদাতাকে যথাযথ নোটিশ ও শুনানির সুযোগ দেওয়া, রিভিশনের ক্ষেত্রে আইনগত শর্ত পূরণ এবং একই আয়ের ওপর একাধিক পর্যায়ে কর আরোপের অভিযোগ—সবগুলো বিষয়ই এ মামলায় আলোচনায় এসেছে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বর্তমানে কর কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী বকেয়া কর আদায়ের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রামীণ কল্যাণ লিভ টু আপিলের উদ্যোগ নেওয়ায় বিষয়টির পরবর্তী আইনগত পরিণতি আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।