
ঢাকায় সব বদলে গেলেও নাবিস্কো মোড়ের বিস্কুটের সেই ঘ্রাণটা আজও বদলায়নি
তেজগাঁওয়ের শিল্প-ঐতিহ্য, নাগরিক স্মৃতি ও একটি পরিচিত মোড়ের গল্প
আদালত বার্তা প্রতিবেদকঃ১৯ আগষ্ট ২০২৬
ঢাকা বদলেছে। বদলেছে নগরীর রাস্তা, যানবাহন, ভবন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন ও মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় যে তেজগাঁও ছিল মূলত শিল্পকারখানা ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর একটি এলাকা, সময়ের প্রবাহে সেই তেজগাঁও আজ রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পুরোনো কারখানার জায়গায় উঠেছে বহুতল ভবন, বেড়েছে যানবাহনের চাপ, বদলেছে চারপাশের দৃশ্যপট।
তবু কিছু জায়গার পরিচয় কেবল স্থাপনা দিয়ে তৈরি হয় না—মানুষের স্মৃতি, অভ্যাস ও অনুভূতিই সেখানে একটি স্থায়ী পরিচয় গড়ে তোলে। ঢাকার নাবিস্কো মোড় তেমনই একটি নাম।
নাবিস্কো মোড় বললেই অনেক ঢাকাবাসীর মনে ভেসে ওঠে তেজগাঁওয়ের ব্যস্ত সড়ক, শিল্পাঞ্চলের পুরোনো আবহ, মানুষের কর্মচাঞ্চল্য এবং বিস্কুট তৈরির সেই পরিচিত ঘ্রাণ। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে; কিন্তু এই নামটি এখনো নাগরিক স্মৃতিতে শক্তভাবে টিকে আছে।
শিল্পাঞ্চল থেকে নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা
তেজগাঁও ঢাকার শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। একসময় এখানে বিভিন্ন কলকারখানা, গুদাম, পরিবহনকেন্দ্র ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মব্যস্ততা ছিল নগরজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শিল্পাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠে দোকানপাট, খাবারের ব্যবসা, পরিবহনব্যবস্থা এবং মানুষের বসতি।
এই শিল্পভিত্তিক পরিবেশের মধ্যেই নাবিস্কো বিস্কুট ও ব্রেড কারখানা একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থাননামও ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে যায়। ফলে ‘নাবিস্কো মোড়’ শুধু একটি রাস্তার মোড় নয়; এটি হয়ে ওঠে একটি নাগরিক ঠিকানা।
আজ কেউ হয়তো গন্তব্য বোঝাতে রাস্তার নাম বা ভবনের নাম ব্যবহার করেন, আবার কেউ এখনো বলেন—‘নাবিস্কো মোড়ে নামবেন।’ এই ব্যবহারই প্রমাণ করে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কীভাবে একটি এলাকার ভৌগোলিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বিস্কুটের ঘ্রাণে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি
পুরোনো ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে খাবারের ঘ্রাণও অনেক সময় স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। কোনো রাস্তার পাশের চায়ের দোকান, পুরোনো বেকারি, মিষ্টির দোকান কিংবা কারখানা—এসবের গন্ধ বহু বছর পরও মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে অতীতে।
নাবিস্কো মোড়ের ক্ষেত্রেও এমন একটি নাগরিক স্মৃতির কথা বলা হয়। বিস্কুট উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কারখানার পরিবেশ থেকে ভেসে আসা ঘ্রাণ অনেকের কাছে ছিল পরিচিত। পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক কিংবা নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষের কাছে সেই ঘ্রাণ হয়ে উঠেছিল জায়গাটির স্বাতন্ত্র্যের অংশ।
এ কারণেই ‘নাবিস্কো মোড়ের বিস্কুটের ঘ্রাণ’ শুধু খাবারের গন্ধের কথা বলে না; এটি আসলে একটি সময়ের কথা বলে—যে সময়ে শিল্পকারখানা ও নগরজীবন পরস্পরের খুব কাছাকাছি ছিল।
পুরোনো ছবি, নতুন ঢাকা
পুরোনো ছবিতে দেখা যায়, নাবিস্কো এলাকার আশপাশে একসময়কার ঢাকার দৃশ্য ছিল অনেকটাই ভিন্ন। অপেক্ষাকৃত কম যানবাহন, নিচু স্থাপনা, শিল্পকারখানার প্রবেশপথ, শ্রমজীবী মানুষের চলাচল এবং সরল নগরপরিবেশ—সব মিলিয়ে সেই ঢাকা ছিল আজকের ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন।
বর্তমানের চিত্র একেবারেই আলাদা। বহুতল ভবন, বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ফুটপাতের ব্যস্ততা এবং মানুষের অবিরাম চলাচলে এলাকাটি এখন নগর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু ছবির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ঢাকার অবকাঠামো বদলেছে, কিন্তু কিছু স্থাননাম মানুষের স্মৃতিতে বদলায়নি।
নাবিস্কো নামটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম হয়ে ওঠে রাস্তার নাম, বাসস্টপের নাম কিংবা এলাকার পরিচিতির অংশ।
নাবিস্কোর ক্ষেত্রেও তেমন একটি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গে যুক্ত ‘নাবিস্কো মোড়’ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার নাগরিক অভিধানের একটি পরিচিত শব্দ।
সরকারি শ্রম-পরিদর্শন সংক্রান্ত তথ্যেও নাবিস্কো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ফ্যাক্টরিকে তেজগাঁও এলাকার নিবন্ধিত ব্রেড ও বিস্কুট শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও শিল্প-সংক্রান্ত নথিতে প্রতিষ্ঠানটির তেজগাঁওয়ের ঠিকানার উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, নাবিস্কো শুধু একটি পণ্য বা ব্র্যান্ডের নাম নয়—ঢাকার শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গেও নামটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
শিল্পঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন
ঢাকার দ্রুত নগরায়ণের ফলে অনেক পুরোনো স্থাপনা, কারখানা ও শিল্পাঞ্চলের চেহারা বদলে যাচ্ছে। উন্নয়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর সঙ্গে শহরের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শহরের ইতিহাস শুধু পুরোনো ভবন বা স্মৃতিস্তম্ভে থাকে না। থাকে রাস্তার নামে, বাজারের নামে, কারখানার নামে, মানুষের মুখে মুখে চলে আসা গল্পে এবং কোনো একটি জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গন্ধ ও অনুভূতিতে।
নাবিস্কো মোড় সেই অর্থে ঢাকার একটি জীবন্ত নাগরিক ঐতিহ্য। এখানে পুরোনো শিল্পনগরীর স্মৃতি এবং আধুনিক ঢাকার ব্যস্ততা পাশাপাশি অবস্থান করছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো গল্প পৌঁছানো জরুরি
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে নাবিস্কো মোড় হয়তো কেবল একটি ব্যস্ত রাস্তার নাম। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে ঢাকার শিল্পায়ন, খাদ্যশিল্পের বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং একটি পরিবর্তনশীল নগরের দীর্ঘ ইতিহাস।
পুরোনো ছবি সংরক্ষণ, প্রবীণ নাগরিকদের স্মৃতিচারণ
সংগ্রহ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নথিভুক্ত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর ঐতিহাসিক পরিচিতি তুলে ধরা হলে ঢাকার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও স্পষ্ট হবে।
কারণ একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু তার নতুন ভবনে নয়; তার সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে পুরোনো স্মৃতির মধ্যেও।
বদলে গেছে ঢাকা, বদলায়নি স্মৃতি
নাবিস্কো মোড়ের চারপাশে হয়তো এখন আগের সেই দৃশ্য নেই। যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে, ভবনের উচ্চতা বেড়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুততর হয়েছে। কিন্তু বহু মানুষের স্মৃতিতে এখনো সেই পুরোনো তেজগাঁও বেঁচে আছে।
কেউ হয়তো সেই পথ দিয়ে স্কুলে গেছেন, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যবসার কাজে; কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে কেনাকাটা করতে গিয়ে পরিচিত সেই বিস্কুটের ঘ্রাণ পেয়েছেন।
তাই নাবিস্কো মোড়ের গল্প মূলত একটি মোড়ের গল্প নয়। এটি ঢাকার বদলে যাওয়ার গল্প এবং একই সঙ্গে ঢাকার কিছু না-বদলানোর গল্প।
সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে যায়। শহরও বদলায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে কিছু নাম, কিছু রাস্তা, কিছু দৃশ্য আর কিছু ঘ্রাণ থেকে যায়—প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
নাবিস্কো মোড়ও তেমনই এক নাম। ঢাকার মানচিত্রে এটি একটি স্থান; আর ঢাকাবাসীর স্মৃতিতে এটি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি।
সম্পাদকীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: নাবিস্কো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ফ্যাক্টরির তেজগাঁওয়ের অবস্থান সরকারি নথিতে পাওয়া যায়; বাংলাদেশে বিস্কুট শিল্পের পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবেও নাবিস্কোর উল্লেখ রয়েছে।