

নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
১৫ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে’ সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কথিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাকে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজার নামে আয়াস ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন সাধারণ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ, হয়রানি এবং মারধর করেন। অভিযোগের তালিকায় একজন সিঙ্গারা বিক্রেতা ও একজন রিকশাচালকের নামও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই এখনো প্রয়োজন। ঘটনাস্থলে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা এতে জড়িত ছিলেন এবং যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করা হয়েছিল তাদের প্রকৃত পরিচয় কী—এসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক—এটি নিজে কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মারধর বা শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয় না। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা এবং প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে কাউকে আটকে রাখা, শারীরিকভাবে আঘাত করা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করা হলে তা আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আয়াসকে ঘিরে এর আগেও শান্তা ফারজানা নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও অভিযোগের বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনকে অবমাননা ও অপপ্রচারের অভিযোগে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন আয়াসসহ রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের কয়েকজন নেতা। পুলিশ জানিয়েছিল, অভিযোগটি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
পরবর্তীতে আল নূর মোহাম্মদ আয়াসের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে অভিযোগ দাখিলের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগ দায়ের করা এবং আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়—এ পার্থক্যটি আইনগত ও সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ধানমন্ডি ৩২-এর মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি রাখে।
২০২৫ সালের ১৫ আগস্টও ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে মানুষকে আটকে রাখা ও মারধরের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এমনকি ওই সময় ধানমন্ডি ৩২ থেকে এক রিকশাচালককে আটকের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছিল।
ফলে এবারের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তার বিচার করার এখতিয়ার আদালতের; কোনো রাজনৈতিক সংগঠন, আন্দোলনের কর্মী বা ব্যক্তির হাতে আইন তুলে নিয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।
এ কারণে ধানমন্ডি ৩২-এর ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে মারধর বা হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতেই পারে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বক্তব্য নেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।
আইনের শাসনের মূল কথা—অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার হাতে নয়। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো নাগরিককে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না; আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহও কাউকে শাস্তি দেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে না।