মামলা জট নিরসনে প্রশংসনীয় উদ্যোগ ১২ কার্যদিবসে হাইকোর্টে ৬২ হাজার ৬৩৭ পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি
প্রকাশিত:
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
১৪
বার পড়া হয়েছে
মামলা জট নিরসনে প্রশংসনীয় উদ্যোগ
১২ কার্যদিবসে হাইকোর্টে ৬২ হাজার ৬৩৭ পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক | আদালত বার্তা
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের মামলা জট নিরসন এবং বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে গৃহীত বিশেষ উদ্যোগ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। প্রধান বিচারপতি বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নির্দেশনায় মাত্র ১২ কার্যদিবসে পুরাতন ক্রিমিনাল মিস ও পুরাতন রিট মামলা মিলিয়ে ৬২ হাজার ৬৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় ১২ কার্যদিবসে হাইকোর্ট বিভাগের ১৩টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে মোট ৫৫ হাজার ৭৩০টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ আগস্ট ২০২৬ একদিনেই ৫ হাজার ৪০৫টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি করা হয়।
মে মাসে শুরু বিশেষ কার্যক্রম
দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন পুরাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত ৭ মে ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল মোশন ও রিট মোশন বেঞ্চসমূহে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোকে পুরাতন ক্রিমিনাল মিস ও পুরাতন রিট মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রথম দিনেই ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে ৩ হাজার ২৪৭টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস এবং রিট মোশন বেঞ্চে ১ হাজার ৭৬৫টি পুরাতন রিট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পুরাতন মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। এর ধারাবাহিক ফল হিসেবেই ১২ কার্যদিবসে ৫৫ হাজার ৭৩০টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা এবং পুরাতন রিট মামলা মিলিয়ে মোট ৬২ হাজার ৬৩৭টি মামলা নিষ্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে।
মামলাজটের বাস্তব চিত্র
দেশের বিচারব্যবস্থায় মামলাজটের ব্যাপ্তি কতটা বড়, সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানেই তার চিত্র স্পষ্ট। জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে মোট ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি দেওয়ানি এবং ২৮ লাখ ২৬ হাজার ২১৩টি ফৌজদারি মামলা।
একই সময়ের হিসাবে আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা বিচারাধীন ছিল। অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি।
ফলে হাইকোর্ট বিভাগের পুরাতন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির এ উদ্যোগকে দেশের সামগ্রিক মামলা জট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্রুত বিচার সাংবিধানিক অধিকার
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সাংবিধানিক অধিকারও সরাসরি জড়িত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
অন্যদিকে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
অর্থাৎ বিচারপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘায়িত না করে যুক্তিসংগত সময়ে মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রার্থীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি যেমন বাড়ে, তেমনি বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একদিনে ৫ হাজার ৪০৫ মামলা নিষ্পত্তি—কেন গুরুত্বপূর্ণ
১৩ আগস্ট একদিনে ৫ হাজার ৪০৫টি পুরাতন ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হওয়া হাইকোর্ট বিভাগের মামলা ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজির তৈরি করেছে।
তবে পরিসংখ্যানের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দ্রুত নিষ্পত্তির অর্থ যেন কোনো মামলার ন্যায়সংগত শুনানি বা পক্ষগুলোর আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন করা না হয়। মামলার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচারের গুণগত মান, শুনানির সুযোগ, বিচারিক নিরপেক্ষতা এবং কারণসম্বলিত আদেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচারের মান ও প্রক্রিয়াগত ন্যায়পরায়ণতাও সমানভাবে বজায় থাকবে।
বিচারব্যবস্থায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
মামলাজট শুধু উচ্চ আদালতের পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিচারাধীন মামলার বড় অংশই অধস্তন আদালতে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জুনে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশে অনুমোদিত ২ হাজার ৬২০টি বিচারকের পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ১ হাজার ৯৬৪ জন—অর্থাৎ ৬৫৬টি পদ শূন্য ছিল।
এ বাস্তবতায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিচারক নিয়োগ, আদালতের অবকাঠামো বৃদ্ধি, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল কজলিস্ট ও ই-জুডিশিয়ারি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো, কার্যকর কেস ম্যানেজমেন্ট এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রি-কেস মধ্যস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০টি জেলায় এ ধরনের মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালুর ফলে ওই জেলাগুলোতে নিয়মিত মামলা দায়েরের হার ৬২.৮৩ শতাংশ কমেছে এবং পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা দেশের সব জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন প্রশংসার দাবিদার
মামলা জট বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় পুরাতন মামলা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির যে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তা সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।
মাত্র ১২ কার্যদিবসে ৬২ হাজার ৬৩৭টি পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে বিচারপ্রার্থীদের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা এবং বিচারিক প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে দীর্ঘদিনের পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
এ ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগের জন্য মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, হাইকোর্ট বিভাগের সকল মাননীয় বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন অবশ্যই ধন্যবাদ ও প্রশংসার দাবিদার।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সহযোগিতার প্রত্যয়
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির এই ধারাকে আরও কার্যকর করতে বিচার বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকেও মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য শুধু মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা বৃদ্ধি নয়—বরং দ্রুত, ন্যায়সংগত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা। তাই পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অধস্তন আদালতসহ বিচারব্যবস্থার সব স্তরে একই ধরনের কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হোক, বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হোক। বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আরও সহজ, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর হোক। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক।
দ্রুত বিচার মানেই শুধু দ্রুত মামলা শেষ করা নয়—দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্য।