
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বিচারকের ফেসবুক পোস্ট: সমালোচনা ও বিতর্ক
বিশেষ প্রতিনিধি, আদালত বার্তা
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত জেলা জজ হাবিবুল্লাহ মাহমুদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’-এর সংশোধনীর সমালোচনা করে তিনি এই পোস্ট দেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রণীত আইনের বিরুদ্ধে একজন বিচারকের এমন প্রকাশ্য মন্তব্য সরাসরি চাকরিবিধির লঙ্ঘন।
কী লিখেছিলেন ওই বিচারক?
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে দেওয়া ওই ফেসবুক পোস্টে বিচারক হাবিবুল্লাহ মাহমুদ দাবি করেন, নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে শরিয়া লঙ্ঘনমূলক দানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। পোস্টে তিনি লেখেন, “সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে যে কারণে সাম্প্রতিক সংশোধনী আনা হয়েছে তা হচ্ছে—পিতা-মাতার জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি দান করে নিঃস্বত্ব হয়ে গেলে পরবর্তীতে সন্তানরা যদি পিতা-মাতার ভরণপোষণ ব্যয় না বহন করে, তবে তারা যে ভোগান্তিতে পড়েন তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। এখানে উদ্দেশ্য যে অতি মহৎ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সমস্যার কারণ নির্ণয় করা।”
তিনি আরও লেখেন, “সমস্যার কারণ হলো পিতা-মাতার জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি দান করে দেওয়া। প্রায় সকল ক্ষেত্রে এই দানের উদ্দেশ্য হয় সম্ভাব্য অপরাপর ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা, যা শরিয়াসম্মত নয়। শরিয়া লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট যে সমস্যা, তা নিরসনে সহজ সমাধান হতে পারত শরিয়ার উক্তরূপ লঙ্ঘন নিষিদ্ধ করা।” এছাড়া পিতা-মাতার ভরণপোষণ নির্বাহে সন্তানদের বাধ্য করার বিধান তৈরির পক্ষেও মত দেন তিনি।
বিচারকের ভাষ্য ও আইনের প্রেক্ষাপট
ফেসবুক পোস্টটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে বিচারক হাবিবুল্লাহ মাহমুদ বলেন, “এটি সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। একটি বিষয় নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা (একাডেমিক ডিসকাশন) থাকতেই পারে। আমি আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে পোস্ট দিইনি।” এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাস হয়। নতুন বিধানে বলা হয়েছে—সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। বিলটি পাসের সময় বিরোধী দল এটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করলেও তা নাকচ হয়ে যায়। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আইনটিকে দেশের কোটি কোটি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য ‘স্বস্তিদায়ক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
চাকরিবিধি ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা কী বলছে?
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মের অন্যান্য শর্তাবলি) বিধিমালা অনুযায়ী, আইন মন্ত্রণালয় বিচারকদের ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে বিচারকের এমন মন্তব্য চাকরিবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে বিচারকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরিশৃঙ্খলা পরিপন্থি কোনো স্ট্যাটাস, মন্তব্য ও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে কড়া নির্দেশ দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছেন, যা চাকরিবিধির পরিপন্থি ও অসদাচরণের শামিল।
এরও আগে, ২০১৯ সালে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের
ফেসবুক ব্যবহারে জারি করা নির্দেশনায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল—নিয়ন্ত্রণকারী বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ বা প্রচার পরিহার করতে হবে। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭ এবং প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুযায়ী পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।