
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ে এস আলম, ব্রিটিশ উকিলদের এক মাসের বিলই প্রায় ৫ কোটি টাকা
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
১১ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থপাচার ও বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের অভিযোগে তদন্ত জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ। এ লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি শীর্ষ আইনজীবী দল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ডেইলি ওয়াদা।
লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার হাতে আসা একটি গোপন আইনি বিলের নথিতে আন্তর্জাতিক সালিসি কার্যক্রম, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দাবি উত্থাপনের প্রস্তুতির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রজেক্ট ভলকান’ কোডনামে পরিচালিত এই আইনি কার্যক্রমের জন্য গত মে মাসে সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের কাছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৪ দশমিক ৭২ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা) বিল পাঠানো হয়। নথিতে কার্যক্রমটিকে ‘সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও অনুরূপ বিষয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় বৈঠক ও শত শত ঘণ্টার প্রস্তুতি
সম্ভাব্য বিনিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ মোকাবিলায় আইনজীবীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে গবেষণা, কৌশল নির্ধারণ, ক্লায়েন্ট বৈঠক, ভ্রমণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগে সময় ব্যয় করেন। মে মাসে মোট ২৬৩ ঘণ্টা ৬ মিনিট বিলযোগ্য কাজ করা হয়।
আইনজীবীদের ঘণ্টাপ্রতি ফি ছিল উল্লেখযোগ্য—জ্যেষ্ঠ অংশীদারদের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪৫ ডলার, কাউন্সেলদের ১ হাজার ৯৫০ ডলার, সিনিয়র অ্যাসোসিয়েটদের ১ হাজার ৬৩০ ডলার, অ্যাসোসিয়েটদের ১ হাজার ৪১০ ডলার এবং প্যারালিগ্যালদের ৫৫৫ ডলার।
নথি অনুযায়ী, মে মাসের শুরুতে আইনজীবী দল ঢাকায় এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৪ মে এক অংশীদার একাই ১৩ ঘণ্টা ৪২ মিনিট বৈঠক ও আলোচনা বাবদ বিল করেন, পরদিন আরও ৮ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট কাজের হিসাব রয়েছে।
সাবেক ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনজীবীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. জাকির হোসেন চৌধুরী এবং পরিচালক কামাল হোসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেখানে ব্যাংকিং নথি পর্যালোচনা, আইনি মতামত প্রস্তুত এবং স্মারকলিপি তৈরির কাজ করা হয়।
জাকির হোসেন চৌধুরী জানান, আলোচনায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উঠে আসে। তবে এস আলম গ্রুপের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক সালিসি ও আইনি কৌশল
নথিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (আইসিএসআইডি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ, সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে গোপন স্মারকলিপি প্রস্তুত, বিনিয়োগ চুক্তিভিত্তিক সালিসি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিষয়ে গবেষণার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এছাড়া বাংলাদেশি গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, চলমান ফৌজদারি মামলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন আইনি বিকল্প বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যক্রম স্থগিতের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করা হয়েছে।
দেশে-বিদেশে তদন্তের বিস্তার
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযোগ, গ্রুপটি মনোনীত পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
অন্যদিকে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে তদন্ত করছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধ সম্পদ অর্জন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার ও প্রতারণামূলক ঋণের অভিযোগে একাধিক তদন্ত চালাচ্ছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২০ বৃহত্তম করপোরেট ঋণখেলাপির মধ্যে ১১টিই এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
সাইপ্রাসে সম্পদ জব্দ ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের অনুরোধে সাইপ্রাসের একটি আদালত সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সম্পদ জব্দ করে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে সংঘটিত বলে অভিযোগ থাকা প্রতারণামূলক ঋণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মোট বিল ও বকেয়া
নথি অনুযায়ী, মে মাসে মোট আইনি ফি ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৮০ ডলার (প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা), যা ১০ শতাংশ ছাড়ের পর দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ভ্রমণ ও অন্যান্য ব্যয়সহ মোট বিল হয় প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
এছাড়া এপ্রিল মাসের প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ না হওয়ায় মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মে মাসের আগেই এই আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক সালিসি কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না বা কোনো সমঝোতা আলোচনা চলছে কি না—সে বিষয়ে নথিতে স্পষ্ট তথ্য নেই।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী দল ও এস আলমের প্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আইনি সংবেদনশীলতার কারণে আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি