
১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি: ন্যায়বিচারের সহায়ক নাকি অতিনির্ভরতার ঝুঁকি?
বিশেষ প্রতিবেদন, আদালত বার্তাঃ২৫ আগষ্ট ২০২৬
“ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ব্যাপক নির্ভরশীলতায় ন্যায়বিচারে বড় বাধা”—আইনগতভাবে আরও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে হলে বলা যায়, ১৬৪ ধারা নিজে ন্যায়বিচারের বাধা নয়; বরং এই ধারায় রেকর্ড করা স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যকে যথাযথ যাচাই, স্বাধীন corroboration ও প্রমাণমূল্যায়ন ছাড়া অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া ন্যায়বিচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক ও প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্তগুলোতেও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, সত্য এবং আইনসম্মতভাবে রেকর্ড করা confession-এর গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে, একই সঙ্গে voluntariness যাচাইয়ের ওপর কঠোর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি: ন্যায়বিচারের সহায়ক নাকি
অতিনির্ভরতার ঝুঁকি
আইনি-বিশ্লেষণঃ
১৬৪ ধারার ওপর অতিনির্ভরতা কি ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা?
ফৌজদারি মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কোনো আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায়, স্বাধীনভাবে এবং সত্য ঘটনা স্বীকার করলে সেই স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে। এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার নিজের দোষ স্বীকারের ভিত্তিতেই দণ্ড দেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একটি ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিকে কি মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের বিকল্প হিসেবে দেখা যায়?
আইন ও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করলে উত্তর হলো—সব ক্ষেত্রে নয়।
১৬৪ ধারার মূল উদ্দেশ্য আসামির কাছ থেকে জোরপূর্বক বা পুলিশি প্রভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করা নয়; বরং পুলিশি তদন্তের বাইরে একজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আসামির স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বক্তব্য রেকর্ড করার একটি সুরক্ষিত ব্যবস্থা তৈরি করা। বর্তমান আইনে নির্দিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত চলাকালে বা তদন্ত শেষে, বিচার শুরুর আগে বক্তব্য বা স্বীকারোক্তি রেকর্ড করতে পারেন।
১৬৪ ধারার মূল সুরক্ষা কোথায়?
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা পড়লে দেখা যায়, স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার দায়িত্ব পুলিশ কর্মকর্তার নয়; বরং আইনানুগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের।
এর সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৩ ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে পুলিশ বা কর্তৃত্বসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে প্রলোভন, ভয়ভীতি বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে বক্তব্য আদায়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় বক্তব্য দিতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়ারও সুযোগ নেই।
অন্যদিকে Evidence Act বা সাক্ষ্য আইনের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আসামির স্বীকারোক্তি যদি অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রলোভন, ভয় বা প্রতিশ্রুতির কারণে দেওয়া হয়েছে বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তা ফৌজদারি মামলায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। ২৫ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া confession এবং ২৬ ধারায় পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি ছাড়া দেওয়া confession-এর বিরুদ্ধে বিশেষ সুরক্ষা রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ আইনটির কাঠামোতেই একটি মৌলিক নীতি রয়েছে—স্বীকারোক্তি হতে হবে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ একটি রায়ে ১৬৪ ধারার confession গ্রহণের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
Death Reference No. 169 of 2017 মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, confession রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে আসামির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অবস্থার বিষয়ে “real and substantial inquiry” করতে হবে। অর্থাৎ শুধু নির্ধারিত ফরম পূরণ বা আনুষ্ঠানিক কয়েকটি প্রশ্ন করাই যথেষ্ট নয়; ম্যাজিস্ট্রেটকে বাস্তবভাবে যাচাই করতে হবে—আসামি অনুশোচনা থেকে স্বীকার করছে কি না, নাকি নির্যাতন, প্রশিক্ষণ/টিউটরিং, ভয়, প্রলোভন বা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে confession দিচ্ছে।
একই রায়ে আদালত আরও বলেছে, ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করে confession রেকর্ড করা হলে Evidence Act-এর ৮০ ধারার অধীনে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে আইনগত আনুষ্ঠানিকতার যথাযথ অনুসরণ না হলে বিষয়টি আদালতের গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এখানে মূল শিক্ষা হলো—১৬৪ ধারার কাগজটি নিজে চূড়ান্ত সত্য নয়; বরং সেটি কী পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কীভাবে রেকর্ড হয়েছে—তা বিচার করা অপরিহার্য।
সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত confession হলে কী হয়?
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান হলো, কোনো আসামির confession যদি আদালতের কাছে সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং তার নিজের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে সেটি তার বিরুদ্ধে substantive evidence হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, confession যদি স্বেচ্ছায় ও সত্যভাবে করা হয় এবং তা confessionকারী আসামির নিজের অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে শুধু সেই confession-এর ভিত্তিতেও তার বিরুদ্ধে conviction দেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব। পরবর্তীতে confession প্রত্যাহার করলেও, আদালত যদি প্রথম confession-টিকে সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে শুধু retraction-এর কারণে সেটি অকার্যকর হয়ে যায় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে Appellate Division বলেছে, confession যদি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়, তাহলে corroboration আইনগতভাবে সবসময় অপরিহার্য নয়; তবে corroboration থাকা rule of prudence বা বিচারিক সতর্কতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানেই ১৬৪ ধারার শক্তি।
কিন্তু একই সঙ্গে এখানেই অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।
আসামির নিজের confession আর co-accused-এর confession এক নয়
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি হলো—নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া confession এবং অন্য আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া confession-এর প্রমাণমূল্য এক নয়।
Evidence Act-এর ৩০ ধারায় যৌথভাবে বিচারাধীন একাধিক আসামির ক্ষেত্রে একজনের confession অন্য আসামির বিরুদ্ধেও আদালত বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে co-accused-এর confession অন্য আসামির বিরুদ্ধে স্বয়ংসম্পূর্ণ substantive evidence হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, co-accused-এর confession সাধারণত অন্য আসামিকে একা দোষী সাব্যস্ত করার substantive evidence নয়; বরং স্বাধীন ও প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে শক্তিশালী বা সমর্থন করার জন্য তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
অতএব—
“এক আসামি বলেছে, তাই অন্য আসামি অপরাধী”—এই সরল সূত্রে বিচার করা আইনসম্মত নয়।
তদন্তের বিকল্প নয় ১৬৪ ধারার বক্তব্য
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা বক্তব্য তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তের বিকল্প নয়।
সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা ১৬৪ ধারার বক্তব্যের সত্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত বিচার করতে পারেন না। এই বক্তব্যের truth, veracity এবং voluntariness বিচার করা বিচারিক আদালতের দায়িত্ব।
অর্থাৎ তদন্তের সময় কোনো আসামি confession করলে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাকে স্বাধীনভাবে অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্য, ফরেনসিক উপাদান, ঘটনাস্থল, মোবাইল বা ডিজিটাল তথ্য, মেডিকেল evidence এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তদন্ত করতে হবে।
শুধু ১৬৪ ধারার একটি বক্তব্যের ওপর তদন্তের পুরো কাঠামো দাঁড় করানো হলে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রিমান্ড, মানসিক চাপ ও voluntariness-এর প্রশ্ন
১৬৪ ধারার confession-এর সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো voluntariness।
আইন আদালতের সামনে confession উপস্থাপনের আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—আসামি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে confession করেছেন?
যদি দীর্ঘ পুলিশি হেফাজত, ভয়, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, প্রলোভন, প্রতিশ্রুতি অথবা অন্য কোনো প্রভাব confession-এর পেছনে থাকে, তাহলে সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আলোচনায় এই কারণেই ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাধীনভাবে voluntariness যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হলো—ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব কেবল confession লিখে রাখা নয়; confession সত্যিই স্বাধীনভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় judicial scrutiny করা।
Retracted confession-এর অবস্থান
অনেক মামলায় দেখা যায়, আসামি প্রথমে ১৬৪ ধারায় confession করেন এবং পরে আদালতে এসে বলেন—তাকে ভয় দেখিয়ে, নির্যাতন করে বা চাপ দিয়ে confession নেওয়া হয়েছিল।
এ ধরনের confession-কে বলা হয় retracted confession।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় retraction করলেই confession স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। আদালত পরীক্ষা করবে—মূল confession সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল কি না।
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তগুলোতে বলা হয়েছে, confession সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হলে পরবর্তী retraction একাই confession-কে অকার্যকর করে না। তবে দ্রুততম সুযোগে retraction করা হলে তা confession-এর voluntariness নিয়ে আসামির বক্তব্যকে সমর্থন করতে পারে—অন্যদিকে বিলম্বিত retraction-এর ওজন পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালত মূল্যায়ন করবে।
অতএব retraction-এর ক্ষেত্রেও আদালতের কাজ হলো যান্ত্রিকভাবে তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে পুরো প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা।
কোথায় ন্যায়বিচারের ঝুঁকি তৈরি হয়?
১৬৪ ধারার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি মূলত কয়েকটি জায়গায়—
প্রথমত, confession-কে তদন্তের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা।
দ্বিতীয়ত, confession-এর সত্যতা যাচাই না করে চার্জশিট বা conviction-এর ভিত্তি তৈরি করা।
তৃতীয়ত, confession-এ অন্য আসামির নাম থাকলেই তাকে অপরাধী ধরে নেওয়া।
চতুর্থত, confession-এর সঙ্গে ঘটনাস্থল, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক evidence, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য circumstantial evidence-এর সামঞ্জস্য পরীক্ষা না করা।
পঞ্চমত, confession-এর ভেতরের অসঙ্গতি বা অসম্ভব তথ্য উপেক্ষা করা।
ষষ্ঠত, retraction-এর পর আসামি কী পরিস্থিতিতে confession করেছিলেন, সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গভীরভাবে পরীক্ষা না করা।
সপ্তমত, ম্যাজিস্ট্রেটের রেকর্ডিং প্রক্রিয়াকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী-looking confession বাস্তবে দুর্বল প্রমাণে পরিণত হতে পারে।
বিচারকের দায়িত্ব: confession গ্রহণ নয়, মূল্যায়ন
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল নীতি হলো—প্রমাণের মূল্যায়ন আদালতের দায়িত্ব।
একটি confession রেকর্ড হয়েছে বলেই আদালত সেটিকে অন্ধভাবে গ্রহণ করতে পারে না। আদালতকে দেখতে হবে—
confession কি আইনানুগভাবে রেকর্ড হয়েছে?
ম্যাজিস্ট্রেট কি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন?
আসামি কি স্বেচ্ছায় confession করেছেন?
confession-এর বর্ণনা কি স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য?
confession-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো কি স্বাধীন evidence দ্বারা সমর্থিত?
confession-এর সঙ্গে মেডিকেল evidence-এর মিল আছে কি?
ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে বক্তব্যের সামঞ্জস্য আছে কি?
confession-এ বর্ণিত তথ্যের কোনো অংশ বাস্তবে যাচাইযোগ্য কি না?
পরবর্তীতে retraction হলে তার সময় ও কারণ কী?
co-accused-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন corroborative evidence আছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে কেবল ১৬৪ ধারার কাগজের ওপর নির্ভর করা হলে বিচারিক মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
“Confession” আর “statement” একই জিনিস নয়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় হলো, ১৬৪ ধারায় শুধু confession নয়, statement-ও রেকর্ড হতে পারে। প্রত্যেক ১৬৪ ধারার বক্তব্য confession নয়।
কোনো বক্তব্যে আসামি নিজের অপরাধের সঙ্গে এমনভাবে নিজেকে যুক্ত করেন, যাতে তার নিজের অপরাধ সংঘটনের inference পাওয়া যায়—তখন সেটি confession-এর চরিত্র ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে নিছক তথ্যবিবরণী confession না-ও হতে পারে।
সুতরাং আদালতকে প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে—নথিভুক্ত বক্তব্যটি প্রকৃতপক্ষে confession কি না এবং হলে তার কোন অংশ confession হিসেবে বিবেচ্য।
১৬৪ ধারাকে দুর্বল নয়, বরং আরও সুরক্ষিত করা প্রয়োজন
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য প্রয়োজন।
১৬৪ ধারাকে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। বরং স্বেচ্ছায় ও সত্যভাবে দেওয়া confession অপরাধের সত্য উদ্ঘাটনে অত্যন্ত কার্যকর একটি আইনগত উপকরণ।
সুপ্রিম কোর্টও বলেছে, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও সত্য confession confessionকারী আসামির বিরুদ্ধে conviction-এর ভিত্তি হতে পারে।
তবে এর অর্থ “১৬৪ ধারার বক্তব্য মানেই অপরাধ প্রমাণ”—এমন কোনো blanket rule নেই।
বরং সঠিক নীতি হলো—
প্রথমে voluntariness, এরপর truthfulness, তারপর evidentiary consistency এবং সর্বশেষ judicial evaluation।
এই চার স্তরের পরীক্ষার মধ্য দিয়েই confession-এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আইনি সংস্কারের প্রয়োজন কোথায়?
বর্তমান আইনগত কাঠামোর মধ্যেই ১৬৪ ধারার বেশ কিছু সুরক্ষা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে—
১. পূর্ণাঙ্গ অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং:
সম্ভব হলে confession রেকর্ডের পুরো প্রক্রিয়া অডিও-ভিডিও ধারণ করা যেতে পারে। এতে voluntariness নিয়ে পরবর্তী বিতর্ক কমতে পারে।
২. ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশ্নোত্তরের বিস্তারিত রেকর্ড:
শুধু prescribed form নয়, আসামিকে কী কী প্রশ্ন করা হয়েছে এবং তিনি কী উত্তর দিয়েছেন—তা বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. confession-এর আগে ও পরে শারীরিক অবস্থার নথি:
আসামির শরীরে আঘাতের চিহ্ন বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে তা দ্রুত নথিবদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
৪. স্বাধীন corroboration-এর গুরুত্ব বৃদ্ধি:
বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে confession-এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন evidence-এর মূল্যায়ন আরও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন।
৫. co-accused-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা:
একজনের confession-এর ওপর অন্য আসামির conviction দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রমাণের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায়বিচারের আসল বাধা কোথায়?
সুতরাং আলোচনার শুরুতে যে প্রশ্ন—“১৬৪ ধারায় ব্যাপক নির্ভরশীলতা ন্যায়বিচারের বড় বাধা কি না”—তার আইনগত উত্তর আরও সূক্ষ্ম।
১৬৪ ধারা নিজে ন্যায়বিচারের বাধা নয়।
বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ judicial safeguard।
কিন্তু—
১৬৪ ধারার confession-এর ওপর অতিরিক্ত, যান্ত্রিক ও সমালোচনাহীন নির্ভরতা ন্যায়বিচারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু দ্রুত conviction নয়; বরং দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা এবং নির্দোষ ব্যক্তিকে ভুলভাবে দণ্ডিত না করা।
এই দুইয়ের ভারসাম্যই ন্যায়বিচারের মূল কথা।
আদালত বার্তার আইনগত পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে বলা যায়, ১৬৪ ধারার confession-এর ক্ষেত্রে তিনটি শব্দ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
“স্বেচ্ছায়, সত্য এবং আইনসম্মতভাবে।”
এই তিনটি শর্তের যেকোনো একটি নিয়ে গুরুতর সন্দেহ থাকলে confession-এর ওপর conviction নির্ভর করার আগে আদালতকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
বিশেষ করে co-accused-এর বিরুদ্ধে confession ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিচারিক scrutiny প্রয়োজন। কারণ একজন আসামির নিজের confession তার নিজের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে; কিন্তু একই বক্তব্য অন্য আসামির বিরুদ্ধে স্বয়ংসম্পূর্ণ substantive evidence হয়ে যায় না—সেখানে স্বাধীন প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক evidence-এর গুরুত্ব অপরিসীম।
শেষ কথা
ন্যায়বিচারের জন্য ১৬৪ ধারাকে দুর্বল করা নয়—১৬৪ ধারার অপব্যবহার ও অতিনির্ভরতা রোধ করাই সময়ের দাবি।
একটি স্বীকারোক্তি অপরাধের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে সত্যিই অপরাধী প্রবেশ করেছে কি না—তা প্রমাণের সামগ্রিক আলোতেই আদালতকে নিশ্চিত হতে হবে।
কারণ আদালতের দায়িত্ব confession সংগ্রহ করা নয়, সত্য উদ্ঘাটন করা।
আর সেই সত্যের পথে সবচেয়ে নিরাপদ নীতি হলো—
“Confession may be powerful evidence, but justice must rest on judicial scrutiny, not on confession alone as a matter of routine.”
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্তগুলোও মূলত এই ভারসাম্যের দিকেই নির্দেশ করে—স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও সত্য confession তার যথাযথ আইনগত মর্যাদা পাবে, কিন্তু তার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণমূল্য নির্ধারণে আদালতের স্বাধীন ও গভীর বিচারিক মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই।