
নতুন নিয়মে জমির নামজারি: ওয়ারিশদের যৌথ খতিয়ান, পৃথক খতিয়ানে বণ্টননামা বাধ্যতামূলক
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জমি কেনা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিংবা অন্য বৈধ উপায়ে জমির স্বত্ব অর্জনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের বা প্রকৃত মালিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি রেকর্ডে মালিকের নাম পরিবর্তন বা নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই নামজারি বা মিউটেশন।
বর্তমানে ই-নামজারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই আবেদন করা যায়। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর পরিপত্র নতুন করে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে, বণ্টননামা ছাড়াই সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করার সুযোগ এবং পৃথক খতিয়ান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বণ্টননামার প্রয়োজনীয়তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নামজারি আসলে কী?
জমি কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা অর্জনের পর সংশ্লিষ্ট সরকারি খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বা মিউটেশন বলা হয়।
নামজারির মাধ্যমে খতিয়ানে সাধারণত মালিকের নাম, পিতা/স্বামীর নাম, ঠিকানা, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং একাধিক মালিক থাকলে তাঁদের হিস্যা সংরক্ষিত হয়। সরকারি ভূমি প্রশাসনের দৃষ্টিতে নামজারি জমির রেকর্ড হালনাগাদ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি নিজে মালিকানার মূল উৎস নয়। মালিকানা নির্ধারণে বৈধ রেজিস্ট্রি দলিল, উত্তরাধিকার, আদালতের ডিক্রি বা অন্য আইনসম্মত স্বত্বের ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ। নামজারি সেই স্বত্বের ভিত্তিতে সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করে।
২০২৫ সালের নতুন নির্দেশনায় কী পরিবর্তন এসেছে?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর পরিপত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর জমির উত্তরাধিকারী একাধিক ব্যক্তি হলে এবং তাঁরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক মালিকানা নির্ধারণ না করলে, সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে একই খতিয়ানে নামজারি করা যাবে।
অর্থাৎ, শুধু বণ্টননামা দলিল নেই—এই কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক ওয়ারিশের আইনগত প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে একই খতিয়ানে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
দুইভাবে নামজারি করা যায়
১. যৌথ নামজারি:
সব ওয়ারিশ একসঙ্গে আবেদন করবেন। জমি ভাগ না হলে একই খতিয়ানে সব ওয়ারিশের নাম ও প্রাপ্য হিস্যা থাকবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা খতিয়ান তৈরির জন্য বণ্টননামা প্রয়োজন হবে না।
২. পৃথক নামজারি:
ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করতে চান, তাহলে কে কোন দাগে বা দাগের কোন অংশে জমি পাবেন—তা নির্ধারণ করে নিবন্ধিত বণ্টননামা/আপস-বণ্টননামা করতে হবে। সেই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারি ও জমাভাগ করা যাবে।
আইনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?
উত্তরাধিকারসূত্রে একাধিক ব্যক্তির ওপর জমির মালিকানা বর্তালে এবং তাঁরা পৃথক নামজারি না করলে একই খতিয়ানে একাধিক মালিকের নাম থাকার আইনগত বাস্তবতা রয়েছে। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৬ ধারাতেও একাধিক মালিকের ক্ষেত্রে একই খতিয়ানে তাঁদের অংশ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণের বিধান রয়েছে। পৃথক অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারির বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়ার পর প্রথমেই “আমার অংশের আলাদা খতিয়ান চাই”—এমন অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে জমিটি যৌথভাবে রাখা হবে, নাকি আইনসম্মত বণ্টনের মাধ্যমে পৃথক করা হবে—তা নির্ধারণ করা জরুরি।
নামজারি না করলে কী সমস্যা হতে পারে?
নামজারি না করেও বৈধ দলিল বা উত্তরাধিকারসূত্রে স্বত্ব থাকতে পারে; তবে সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম হালনাগাদ না থাকলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাস্তব জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে—
ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা সংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদে সমস্যা হতে পারে;
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে রেকর্ড জটিলতা তৈরি হতে পারে;
জমি হস্তান্তরের সময় ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রেকর্ড যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে;
একই জমি নিয়ে একাধিক দাবি বা ভুল রেকর্ড থাকলে বিরোধ নিষ্পত্তি কঠিন হতে পারে;
পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকার নির্ধারণেও জটিলতা বাড়তে পারে।
সরকারি ভূমি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী নামজারি সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট জমির জন্য খতিয়ান তৈরি হয় এবং সেখানে মালিকের নাম, দাগ, জমির পরিমাণ ও মালিকদের হিস্যা ইত্যাদি তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
জমি কেনার পর কী করবেন?
ক্রয়সূত্রে জমি অর্জনের ক্ষেত্রে ক্রেতার উচিত রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নামজারি আবেদন করা।
ই-নামজারি আবেদনে সাধারণত জমির খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, আবেদনকৃত জমির পরিমাণ, দলিল নম্বর ও তারিখ, রেকর্ডীয় মালিকের তথ্য এবং আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানার মতো তথ্য দিতে হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন নির্দেশিকায় এসব তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারিতে কী কী কাগজ লাগতে পারে?
সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে—
মৃত ব্যক্তির খতিয়ান/পূর্ববর্তী রেকর্ড;
ওয়ারিশ সনদ;
মৃত্যুসনদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে;
আবেদনকারী ও অন্যান্য ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য;
জমির দাগ ও খতিয়ান সংক্রান্ত তথ্য;
পূর্ববর্তী দলিল বা স্বত্বের কাগজপত্র;
বণ্টননামা, যদি পৃথক খতিয়ান সৃষ্টির আবেদন করা হয়;
প্রযোজ্য সরকারি ফি পরিশোধের প্রমাণ।
তবে নির্দিষ্ট মামলার প্রকৃতি, জমির রেকর্ড এবং স্বত্বের উৎস অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
নামজারির সরকারি ফি কত?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ভূমিসেবা ফি তালিকা অনুযায়ী মিউটেশনের ক্ষেত্রে—
আবেদনের কোর্ট ফি — ২০ টাকা
নোটিশ জারি ফি — ৫০ টাকা
ডিসিআর ফি — ১,১০০ টাকা
এ ছাড়া রিভিউয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি রয়েছে।
অতএব, নামজারির নামে সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হলে আবেদনকারীকে সতর্ক থাকা উচিত।
কতদিনে নামজারি সম্পন্ন হওয়ার কথা?
ই-নামজারি ব্যবস্থায় নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ করে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে শুনানি, কাগজপত্রের ঘাটতি, আপত্তি, মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা রেকর্ডের অসঙ্গতি থাকলে বাস্তবে সময় বেশি লাগতে পারে।
নামজারি মঞ্জুর হলে মিউটেশন খতিয়ান প্রস্তুত করা হয় এবং নির্ধারিত ডিসিআর ফি পরিশোধের পর অনলাইন থেকে খতিয়ান ও ডিসিআর প্রিন্ট করার সুযোগ রয়েছে।
পুরোনো নামজারি থাকলে কি আবার করতে হবে?
যেসব জমির নামজারি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং খতিয়ানে মালিকের তথ্য সঠিক রয়েছে, শুধু নতুন নির্দেশনা জারি হয়েছে বলে সাধারণভাবে আবার নামজারি করার প্রয়োজন নেই।
তবে পুরোনো রেকর্ডে ভুল, উত্তরাধিকারীর নাম বাদ পড়া, দাগ বা জমির পরিমাণে অসঙ্গতি কিংবা রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা আইনগত প্রতিকারের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
অনলাইনে নামজারি কীভাবে করবেন?
বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল মিউটেশন ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন করা যায়। আবেদন করার সময় জমির খতিয়ান, দাগ, জমির পরিমাণ, দলিলের তথ্য এবং আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দিতে হয়।
আবেদন অনুমোদন বা নামঞ্জুরের তথ্য এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয় এবং অনলাইন সিস্টেমে আবেদনটির অগ্রগতিও দেখা যায়।
জমির মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
জমি কেনার আগে শুধু দলিল দেখলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান, দাগ, জমির পরিমাণ, পূর্ববর্তী মালিকানা, ভূমি উন্নয়ন কর, দখল এবং উত্তরাধিকারসূত্রে হলে সব ওয়ারিশের অবস্থান যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে একজন ওয়ারিশ এককভাবে পুরো জমির মালিক দাবি করতে পারেন না, যদি অন্য ওয়ারিশদের আইনগত হিস্যা থাকে। যৌথ নামজারি হলে প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ রেকর্ডে প্রতিফলিত হবে; আর নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করতে হলে আইনসম্মত বণ্টন ও পৃথক নামজারির প্রয়োজন হবে।
শেষ কথা
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো উত্তরাধিকারসূত্রে জমির নামজারি নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি জটিলতা দূর করা। এখন বণ্টননামা না থাকলেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা সম্ভব। তবে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামার প্রয়োজন হবে।
ফলে জমির মালিকদের উচিত দলিল ও রেকর্ড যাচাই করে সময়মতো নামজারি করা এবং উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে যৌথ মালিকানা ও পৃথক মালিকানার আইনগত পার্থক্য বুঝে পদক্ষেপ নেওয়া। প্রয়োজনে জটিল বা বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
সম্পাদনা-নোট: প্রতিবেদনে “নতুন আইন” শব্দটির বদলে “ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর পরিপত্র/নির্দেশনা” বলা আইনগতভাবে বেশি নির্ভুল। কারণ এখানে মূল পরিবর্তনটি নতুন সংসদীয় আইন নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারি বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নির্দেশনা। সরকারি মিউটেশন সিস্টেম ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ফি-তালিকার তথ্যও মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।