
নিজস্ব প্রতিবেদক | আদালত বার্তাঃ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬গাইবান্ধায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ এক আসামির নামে ভুয়া জামিনের রিকল (জামিন আদেশ) তৈরি করে থানায় জমা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মামলা নিষ্পত্তি ও জামিন করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আসামির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ আদালতের বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান ও মুহুরী শাহীনের বিরুদ্ধে।
টাকা নিয়ে ভুয়া কাগজ হস্তান্তর
জানা যায়, নারী নির্যাতন মামলার আসামি জান্নাতুল ইসলাম গত ২১ সেপ্টেম্বর তার জামিনের আদেশের কপি (রিকল) হাতে পান। আদালতের নিয়ম অনুযায়ী তিনি সেটি গোবিন্দগঞ্জ থানায় জমা দেন। কিন্তু থানায় যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনি জানতে পারেন, তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া জামিনের আদেশটি সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা।
ভুক্তভোগী আসামির আত্মীয় সাজু মিয়া আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, “পেশকারসহ অন্যরা একসঙ্গে বসে আমাদের আশ্বস্ত করেছিল যে, ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিলে জামিন করানোসহ মামলাটি পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া হবে। তাদের কথামতো আমরা ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রদান করি।”
প্রতারণার শিকার জান্নাতুল ইসলাম বলেন, “আমাকে ফোনে জানানো হয় আমার জামিন হয়ে গেছে। শুনে আমি খুশি হই। কিন্তু এখন জানতে পারছি আমার কোনো জামিনই হয়নি; থানায় যে কাগজ পাঠানো হয়েছে, সেটি ভুয়া।”
আদালত বসেনি, তবুও ইস্যু হলো রিকল
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর বিচারক না থাকায় গাইবান্ধার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর কোনো কার্যক্রম চলেনি এবং কোনো মামলার শুনানিও হয়নি। আদালত না বসার দিনে কীভাবে একটি মামলার জামিনের রিকল ইস্যু হলো, তা নিয়ে আদালতপাড়ায় ব্যাপক বিস্ময় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্তদের দায় অস্বীকার
তবে অভিযুক্ত মুহুরী ও বেঞ্চ সহকারী এই জালিয়াতির দায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। মুহুরী শাহীন বলেন, “আমি ২২ তারিখে দরখাস্ত জমা দিয়েছি। রিকলটি কীভাবে বা কার হাত দিয়ে তৈরি হলো, তা আমার জানা নেই।”
অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান দাবি করেন, “আমি এই রিকল দিইনি, এটি তারা নিজেরাই ভুয়াভাবে তৈরি করে থানায় দাখিল করেছে। এ বিষয়ে একটি জিডি করার খসড়া তৈরি করে রেখেছি, তবে নানা ঝামেলার কারণে এখনো করা হয়ে ওঠেনি।”
আইনজীবীদের ক্ষোভ ও শাস্তির দাবি
জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ২২ সেপ্টেম্বর আসামির পক্ষে আদালতে নতুন করে বৈধভাবে জামিনের আবেদন করা হয়। এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আদালতের আইনজীবীরা।
ট্রাইব্যুনাল-২ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবু বকর সিদ্দিক ছানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। এটি শুধু আদালতের নয়, গোটা গাইবান্ধা জেলার সম্মানহানি করেছে। যারা এই ভুয়া রিকল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, এর আগেও গাইবান্ধার আদালতে এক সাবালক আসামিকে নাবালক সাজিয়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। সেসময় আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকার পরও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের দাবি, আদালতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন জালিয়াতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।