সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
Title :
ড. এস জয়শঙ্কর ও কিয়োকো: টোকিওর বসন্তে বোনা এক অনন্য ভালোবাসার গল্প ব্যাংক কর্মকর্তাকে হেনস্তা: ‘মোবাইল সাংবাদিকতা’ নিয়ন্ত্রণে আইনি নোটিশ ১০ বছরের মধ্যে এআই ‘সবাইকে মেরে ফেলবে’, প্রযুক্তিবিদের সতর্কবার্তায় তোলপাড় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট-হরতাল ডাকা অবৈধ: হাইকোর্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা রিট হাইকোর্টে খারিজ দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন: অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও বাণিজ্য অবরোধ বন্ধের কড়া বার্তা শি জিনপিংয়ের জোরপূর্বক পদত্যাগ বৈধ নয়: হাইকোর্ট মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে হারালে দল মেনে নেবে না: আইনমন্ত্রী আইন পেশায় আসার আগে ভাবুন: শুধু সনদ নয়, দক্ষতাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ রাজধানীর লালবাগে ভাড়া বাসা থেকে আইনজীবীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

ড. এস জয়শঙ্কর ও কিয়োকো: টোকিওর বসন্তে বোনা এক অনন্য ভালোবাসার গল্প

  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে

ড. এস জয়শঙ্কর ও কিয়োকো: টোকিওর বসন্তে বোনা এক অনন্য ভালোবাসার গল্প

বিশেষ প্রতিবেদন,আদালত বার্তাঃ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ 

​বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে যখন তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন, তখন সারা বিশ্ব তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও প্রখর কূটনৈতিক শৈলীর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তিনি ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। তবে আজ তাঁর কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে না। বরং আজ তুলে ধরা হবে পর্দার পেছনের এমন এক গল্প, যা আমাদের শেখায়—নিয়তি কীভাবে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড় সামলে ওঠার পর আবারও ভালোবাসার স্নিগ্ধ আলো ফিরিয়ে আনে।

​এটি ড. এস জয়শঙ্কর এবং তাঁর জাপানি স্ত্রী কিয়োকো সোমেকাওয়ার এক অনন্য প্রণয় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার কাহিনী।

​অকাল শূন্যতা ও একাকীত্বের প্রহর

এই গল্পের শুরুটা টোকিওতে নয়, হয়েছিল দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) ক্যাম্পাসে। সেখানে পড়াশোনা করার সময় জয়শঙ্করের পরিচয় হয় তাঁর প্রথম স্ত্রী শোভার সাথে। প্রেম থেকে বিয়ে—জীবন চলছিলো এক সুন্দর ছন্দে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় শোভা ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং অকালেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।

​দুটি ছোট সন্তান, ধ্রুব ও মেধাকে বুকে নিয়ে এক লহমায় যেন ভীষণ একা হয়ে যান জয়শঙ্কর। মাতৃহীন সন্তানদের মুখ আর নিজের একাকীত্ব—একজন বাবার জন্য সেই সময়টা কতটা বিষাদময় ছিল, তা হয়তো সাধারণ শব্দে প্রকাশ করা কঠিন।

​টোকিওর বসন্ত এবং এক নতুন সূচনা (১৯৯৬)

সময়টা ১৯৯৬ সাল। ড. জয়শঙ্কর তখন ফেলে আসা স্মৃতি আর মন খারাপের মেঘ বুকে নিয়ে জাপানের টোকিওতে ভারতীয় দূতাবাসে ‘ডেপুটি চিফ অব মিশন’ হিসেবে নিযুক্ত হন। ঠিক সেই সময়, টোকিওর এক মনোহরী সন্ধ্যায়, ভারত-জাপান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আসরে তাঁর জীবনে আসেন কিয়োকো সোমেকাওয়া।

​ভিড়ের মাঝে প্রথাগত জাপানি নম্রতা আর শান্ত চোখের অধিকারী কিয়োকোকে দেখে প্রথম দর্শনেই থমকে গিয়েছিলেন জয়শঙ্কর। পরিচয়ের শুরুতেই তাঁদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতার বাইরে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ তৈরি হয়। কিয়োকোর মৃদু হাসি আর স্নিগ্ধ আচরণ এক লহমায় জয়শঙ্করের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল।

​নীরব সমর্থন থেকে গভীর অনুরাগ

কাজের সূত্রে তাঁদের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। জয়শঙ্কর তখন নতুন এক দেশে একা, আর কিয়োকো ছিলেন সেই দেশেরই বাসিন্দা। জয়শঙ্করের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং গম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একাকী ও যত্নশীল এক বাবাকে চিনতে কিয়োকোর বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি।

​তাঁদের এই সম্পর্কের শুরুটা কোনো নাটকীয়তায় ভরা ছিল না; তা ছিল ভীষণ শান্ত ও গভীর। টোকিওর চেরি ব্লসমের (Cherry Blossom) নিচে হাঁটতে হাঁটতে জয়শঙ্কর যখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টের কথা—স্ত্রী শোভার চলে যাওয়া এবং দুই সন্তানের একাকীত্বের গল্প বলছিলেন, কিয়োকো তখন কোনো প্রথাগত সান্ত্বনার বাণী না দিয়ে শুধু নীরব শ্রোতা হয়ে পাশে থেকেছেন।

​কিয়োকোর সেই সহানুভূতিশীল নীরবতা জয়শঙ্করের মনে এক নতুন অনুরাগের জন্ম দেয়। অন্যদিকে, জয়শঙ্করের সততা আর সন্তানদের প্রতি তাঁর সীমাহীন দায়িত্ববোধ কিয়োকোকে মুগ্ধ করে। কিয়োকো কেবল জয়শঙ্করের বন্ধুই হননি, বরং নিজের অজান্তেই তাঁর মাতৃহীন সন্তানদের পরম মমতায় আগলে রাখতে শুরু করেন।

​নিয়তির অদ্ভুত মেলবন্ধন ও পরিণয় (১৯৯৮)

তাঁদের এই নীরব ও গভীর ভালো লাগা যখন পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল, তখন সামনে আসে প্রকৃতির এক অদ্ভুত রহস্য। ড. জয়শঙ্কর এবং কিয়োকো—দুজনেরই জন্মদিন একই দিনে, ৯ জানুয়ারি! একেই হয়তো বলে ঈশ্বর-নির্ধারিত মেলবন্ধন। এরপর ১৯৯৮ সালে তাঁরা অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিয়োকো নিজের চেনা টোকিও, নিজের ভাষা ও সমাজ ছেড়ে চিরদিনের জন্য পাড়ি জমান ভারতে।

​জাপানি কন্যা থেকে আদ্যোপান্ত ‘ভারতীয় বধূ’

একটি ভিনদেশি সংস্কৃতিকে নিজের করে নেওয়া কখনোই সহজ কাজ নয়। কিন্তু কিয়োকো জয়শঙ্কর তা অত্যন্ত সাবলীলভাবে করে দেখিয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় পুত্র অর্জুন। তিন সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁদের এক নতুন, পরিপূর্ণ সংসার।

​আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিয়োকো আজ শুধু ভারতীয় সংস্কৃতিকেই আপন করে নেননি, তিনি চমৎকার হিন্দিও বলতে পারেন। ভারতের বড় বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিদেশি অতিথিদের নৈশভোজ কিংবা বৈশ্বিক মঞ্চে—যখনই তিনি শাড়ি পরে, কপালে ছোট্ট টিপ দিয়ে ড. জয়শঙ্করের পাশে এসে দাঁড়ান, পুরো বিশ্বের নজর কাড়েন। ২০২৩ সালের বিখ্যাত জি-২০ (G20) শীর্ষ সম্মেলনেও বিশ্বনেতাদের স্ত্রীদের কাছে ভারতীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিয়োকো পর্দার আড়ালে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

​বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে নিরলস লড়াই করা মানুষটির সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস তাঁর ঘরে থাকা এই জাপানি কন্যা—যিনি নিজের ভালোবাসা আর মমতায় জুড়ে দিয়েছেন দুটি ভিন্ন দেশ এবং সংস্কৃতিকে। একটি সফল সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি যে একে অপরের সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মাঝেই নিহিত, ড. জয়শঙ্কর ও কিয়োকোর জীবন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট