
ধর্মীয় পরিচয় নয়, অপরাধের বিচারই হোক—ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন
সম্পাদকীয় আদালত বার্তাঃ২৪ শে অক্টোবর ২০২৬
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমাজে নৈতিকতা, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, আলেম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অনেক বেশি। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহি, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের প্রশ্ন।
তবে একটি মৌলিক বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন—অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের কারণে অভিযোগকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচারপ্রক্রিয়ার।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে যদি বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ,
হুমকি, হামলা, মব তৈরি কিংবা কোনো ব্যক্তির বাড়িতে আক্রমণের আহ্বান জানানো হয়, তাহলে সেটি সমস্যার সমাধান করে না; বরং আইনের শাসনকে দুর্বল করে। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তার প্রতিকার হতে হবে আইন ও ন্যায়বিচারের পথে—মবের মাধ্যমে নয়।
একইভাবে, কোনো অভিযোগের প্রতিবাদকারী বা ভুক্তভোগীর পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই ‘ইসলামবিদ্বেষী’, ‘নাস্তিক’ কিংবা ধর্মের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। আবার কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যক্তির অপরাধ বা কথিত অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা বা সব আলেম-উলামাকে দায়ী করাও একইভাবে অন্যায় ও অবিবেচনাপ্রসূত।
একজন ব্যক্তির অপরাধ পুরো ধর্মের অপরাধ নয়; আবার ধর্মীয় পরিচয় কোনো ব্যক্তির অপরাধের ঢালও হতে পারে না।
ধর্মীয় পোশাক, পদবি বা পরিচয় একজন মানুষকে সম্মানিত করতে পারে, কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নিতে পারে না। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির পোশাক, দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, পদবি বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাকে অপরাধী হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি।
বিশেষ করে শিশু বা নারীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপ থেকে তাকে মুক্ত রাখা এবং অভিযোগ তদন্তে প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবার দায়িত্ব।
একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষক, পরিচালক, দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগটি ধামাচাপা দেওয়া নয়; বরং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তদন্তে সহযোগিতা করা। অভিযোগকারীকে হেয় করা, ভয় দেখানো কিংবা সামাজিকভাবে একঘরে করার সংস্কৃতি কখনোই ন্যায়বিচারের পথ হতে পারে না।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া, অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা, উত্তেজনা সৃষ্টি করা কিংবা জনতার বিচার দাবি করাও বিপজ্জনক। এতে একজন নির্দোষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, আবার প্রকৃত অপরাধীও আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ধর্মকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনো অভিযোগকারীকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়; বরং সত্য উদঘাটন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কারণ ধর্মীয় নৈতিকতার মূল শিক্ষা যদি সত্য, ন্যায়, সংযম, মানবিকতা ও মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান হয়, তাহলে সেই মূল্যবোধ বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
আজকের সমাজে তাই প্রয়োজন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ের বিচার নয়, তার কর্মকাণ্ডের বিচার; অভিযোগের প্রচার নয়, সত্যের অনুসন্ধান; মবের হুমকি নয়, আইনের শাসন; এবং অন্ধ পক্ষপাত নয়, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে অবস্থান।
কোনো ব্যক্তি আলেম হোন, শিক্ষক হোন, ধর্মীয় নেতা হোন কিংবা সাধারণ নাগরিক—আইনের চোখে প্রত্যেকের অধিকার ও দায়বদ্ধতা সমান। একইভাবে কোনো ব্যক্তি ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী কিংবা অভিযুক্ত—যে পরিচয়েরই হোন না কেন, তাঁর মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড হলো—কার পরিচয় কী, তা নয়; সত্য কী, অপরাধ হয়েছে কি না এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে কি না—সেটিই মুখ্য।