

নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ২৩ অক্টোবর ২০২৬
পাহাড়ের মেঘ, সবুজের সমারোহ, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক ছুটে যান সাজেক, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে কয়েকটি দিন কাটানো, পাহাড়ি সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে থাকার সুযোগই এসব অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ।
তবে পর্যটকের চোখে যে পাহাড় কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক, সেই পাহাড়ের বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, পাহাড়ি পথ, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এবং প্রত্যন্ত জনপদ—সব মিলিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন, দুর্গম এলাকায় চলাচল, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রয়োজনের সময় নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার মতো বহুমাত্রিক দায়িত্ব তাঁদের পালন করতে হয়। তাঁদের দায়িত্বের প্রকৃতি ও কর্মপরিবেশের প্রতি সম্মান জানানো নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে পাহাড়ের নিরাপত্তা কেবল একটি বাহিনীর দায়িত্ব—এমন ধারণাও সঠিক নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জনপ্রতিনিধি এবং পর্যটকদেরও নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিটও পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সুরক্ষাকে তাদের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে; তাদের চট্টগ্রাম বিভাগের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলও রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি পর্যটন অঞ্চল নয়। এখানকার পাহাড়, বন, নদী, ঝরনা ও উপত্যকার সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। ফলে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নথি ও সাম্প্রতিক বক্তব্যেও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শান্তি ও সম্প্রীতির বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে দেখার গুরুত্ব উঠে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়ও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
পাহাড়ে ভ্রমণের সময় পর্যটকদেরও কিছু মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। অনুমোদিত ও নিরাপদ পর্যটনপথ ব্যবহার করা, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলা, দুর্গম এলাকায় একা না যাওয়া, স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান দেখানো এবং পরিবেশের ক্ষতি না করা—এসবই দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশ।
বিশেষ করে কোনো এলাকায় নিরাপত্তাজনিত নির্দেশনা বা চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলে তা অমান্য করে ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। কারণ একটি অসতর্ক সিদ্ধান্ত শুধু একজন পর্যটকের জন্য নয়, তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যদের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।
পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। ২০২৬ সালের মে মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বক্তব্যে পাহাড়কে পর্যটনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই পাহাড়ের পর্যটন উন্নয়নকে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, জরুরি সেবা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পর্যটন সহায়তা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকার যেমন পর্যটকের রয়েছে, তেমনি পাহাড়ের মানুষের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারও রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে পারে দায়িত্বশীল ও টেকসই পাহাড়ি পর্যটনের মূল ভিত্তি।
আমরা যখন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘ দেখি, ঝরনার শব্দ শুনি কিংবা সবুজ প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় হারিয়ে যাই, তখন সেই সৌন্দর্যের পেছনে থাকা নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বের বিষয়টিও মনে রাখা প্রয়োজন।
দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সকলের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
পাহাড় শান্ত থাকুক।
পাহাড়ের মানুষ নিরাপদে থাকুক।
প্রকৃতি থাকুক সুরক্ষিত।
আর প্রতিটি পর্যটকের পাহাড়যাত্রা হোক নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও আনন্দময়।