
শুধু নথিপত্র যাচাইয়ের অজুহাতে পুরোনো কর নির্ধারণ পুনরায় খোলার সুযোগ নেই: হাইকোর্ট
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারার ক্ষমতার অপপ্রয়োগ রোধে সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় প্রকাশ
আদালত বার্তা ডেস্কঃ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা: কর নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শুধুমাত্র আয় বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের (Verification) উদ্দেশ্যে কোনো পুরোনো কর ফাইল বা অ্যাসেসমেন্ট পুনরায় খোলার এখতিয়ার কর কর্তৃপক্ষের নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছেন, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারা অনুযায়ী সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় উন্মোচনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে উপকর কমিশনারের ‘বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ’ (Reason to believe) থাকা বাধ্যতামূলক আইনি পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সর্দার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষে দায়ের করা রিট পিটিশন (নং ৬২৪৯/২০২৫)-এ এই চূড়ান্ত রায় দেন। গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ঘোষিত এ রায়ের ৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কর কর্তৃপক্ষ ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারা উল্লেখ করে জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে কয়েকটি পৃথক নোটিশ পাঠায়। ওই নোটিশগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬-২০১৭, ২০১৭-২০১৮, ২০১৮-২০১৯ এবং ২০২০-২০২১ করবর্ষের ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া চূড়ান্ত কর নির্ধারণ পুনরায় খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
কর কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, প্রতিষ্ঠানের আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যাংকিং ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র পুনঃযাচাই করা প্রয়োজন। এই যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর আয়কর রিটার্ন এবং বিস্তারিত কাগজপত্র পুনরায় দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের এই নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্টে রিট দায়ের করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক শুনানিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে নোটিশগুলোর কার্যকারিতা স্থগিতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন।
মামলার রুল শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারার বিধান বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন:
১. আইনি পূর্বশর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক: ২১২ ধারার অধীনে কোনো সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় খুলতে হলে উপকর কমিশনারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক এমন বিশ্বাসযোগ্য উপাদান থাকতে হবে, যা যুক্তিসংগতভাবে প্রমাণ করে যে করদাতা প্রদেয় কর ফাঁকি দিয়েছেন বা পরিশোধ এড়িয়ে গেছেন।
২. যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে উন্মোচনের সুযোগ নেই: কোনো সুনির্দিষ্ট কর ফাঁকির অভিযোগ ছাড়া কেবল ‘নথিপত্র নিরীক্ষা’ বা ‘আয়ের উৎস যাচাই’ করার জন্য নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া পুরোনো ফাইল পুনরায় তলবের আইনি কর্তৃত্ব উপকর কমিশনারকে দেওয়া হয়নি।
৩. এখতিয়ারের সীমা লঙ্ঘন: আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে অভিমত দেন, আলোচ্য মামলায় সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উপাদান ও কারণ ছাড়াই পুরোনো কর নির্ধারণ পুনরায় উন্মোচন করতে নোটিশ দিয়ে আইনের ২১২ ধারার প্রদত্ত এখতিয়ারের সীমা স্পষ্টত অতিক্রম করেছে।
এসব আইনি পর্যবেক্ষণের আলোকে হাইকোর্ট বিভাগ জারিকৃত রুল যথাযথ (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা ২১২ ধারার অধীন নোটিশ এবং তৎসংক্রান্ত অন্যান্য পত্রগুলোকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত, অবৈধ এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন (Without lawful authority and of no legal effect) ঘোষণা করে বাতিল করে দেন।

এই রায়ের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী অডিট ও পুরোনো অ্যাসেসমেন্ট খোলার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির স্থাপিত হলো। আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা আইন দ্বারা কঠোরভাবে সীমিত ও সুনির্দিষ্ট। কোনো করদাতার দীর্ঘদিনের অতীতের চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া কর ফাইল কেবল সাধারণ সন্দেহের বশে বা নথিপত্র পুনঃপরীক্ষার নামে ইচ্ছামতো পুনরায় খুলে করদাতাকে হয়রানি করার সুযোগ আয়কর আইন, ২০২৩ সমর্থন করে না।