
হাইকোর্টে বাড়ছে রিট নিষ্পত্তি: বিচারিক শৃঙ্খলায় কমবে মামলার পাহাড়।
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আদালতে বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে দায়ের করা রিটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মামলার এই চাপ আরও অনেকাংশে কমে আসবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “বিচারিক শৃঙ্খলা আনতে পারলে রিট মামলার সংখ্যা এমনিতেই কমে আসবে। আমার দৃষ্টিতে, আদালতে যদি শৃঙ্খলা থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার পায়।”
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও এই আশার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৪ হাজার ১১২টি নতুন রিট দায়ের হয় এবং নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) চিত্রটি দারুণভাবে পালটে যায়। এ সময়ে ৪ হাজার ৭২৯টি নতুন রিট দায়ের হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি—৯ হাজার ৫৯০টি মামলা। ফলশ্রুতিতে জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
হাইকোর্টে এখনও লক্ষাধিক রিট বিচারাধীন থাকার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ বা জনস্বার্থ মামলার নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থে রিট দায়ের করা হয়। এগুলোর মূল উদ্দেশ্যই থাকে আত্মপ্রচার। অনেকেই রিট করার সঙ্গে সঙ্গেই মিডিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান, যা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত।”
তিনি বিচারিক বিশৃঙ্খলার কিছু দিক তুলে ধরে জানান, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের রায় মানা হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। কোন মামলাগুলো হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবে, তা আপিল বিভাগ অনেক আগেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন চলে না মর্মে সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায় থাকলেও, অনেক সময় হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চ তা গ্রহণ করে আদেশ দিচ্ছেন।
পাশাপাশি, জমি দখল, সীমানা বিরোধ বা বিল-বাঁওড়ের মতো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আইন অনুযায়ী নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাওয়ার কথা। কিন্তু সেই প্রচলিত পদ্ধতিকে বাইপাস করে সরাসরি হাইকোর্টে রিট দায়েরের প্রবণতা বেড়েছে। এই বিশৃঙ্খলার জায়গাগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেলে রিট মামলার জট দ্রুত নিরসন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সংবিধানে রিটের বিধান ও প্রকারভেদ
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে মূলত পাঁচ ধরনের রিট দায়েরের সুযোগ রয়েছে:
জনস্বার্থে রিটের ঐতিহাসিক সাফল্য
কিছু ক্ষেত্রে রিটের অপব্যবহার হলেও, জনস্বার্থে এর অসামান্য অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়েই মূলত দেশে জনস্বার্থে রিট মামলার আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। এই যুগান্তকারী রায়ে বলা হয়, ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করতে পারবেন।
গত কয়েক দশকে এই রিটের মাধ্যমেই অভাবনীয় আইনি সাফল্য এসেছে দেশে। রিটের রায়ের মাধ্যমেই দেশের নদীগুলো ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নদ-নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, পাহাড় কাটা রোধ, দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নারী-শিশুসহ
প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় রিট মামলাগুলো দেশের বিচারব্যবস্থায় এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে আসছে। অনেক সময় একজন ব্যক্তির দায়ের করা রিটের সুফল ভোগ করছেন দেশের হাজারো মানুষ।