
আইনজীবী হলেই জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা যায় না: হাইকোর্ট
পাশের জমির মালিক হলেই রাজউকের বরাদ্দ ঠেকানোর অধিকার জন্মায় না • রিট খারিজ
নিজস্ব প্রতিবেদক,আদালত বার্তাঃ১ নভেম্বর ২০২৬
কেবল আইনজীবী হওয়া কিংবা জনস্বার্থ রক্ষার সাধারণ দাবি করলেই কোনো ব্যক্তি সরকারের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার অধিকার পান না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত, সম্পত্তিগত কিংবা আইনস্বীকৃত স্বার্থ থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী বা সংলগ্ন জমির মালিক হওয়ার সুবাদে সরকারি কোনো প্লট বরাদ্দ চ্যালেঞ্জ করার আইনগত অধিকারও (Locus Standi) তৈরি হয় না।
রাজধানীর বনানীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একটি আবাসিক প্লট বিকল্প বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে দায়ের করা রিট পিটিশন খারিজ করে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন (রিট পিটিশন নং: ১১৮২৮/২০১৬, আবদুল বাসেত মজুমদার (মৃত) ও অন্যান্য বনাম রাজউক ও অন্যান্য)।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে মো. জিয়াউল হক মিয়ানের অনুকূলে গুলশান আবাসিক এলাকায় একটি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। তবে গুলশান লেকের লে-আউট পরিকল্পনা চূড়ান্ত না থাকায় রাজউক তাঁকে ওই প্লটের দখল বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর বনানী আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের ‘ডি’ ব্লকের ২৪ নম্বর প্লটটি বিকল্প হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত নিবন্ধিত লিজ দলিল সম্পাদিত হয়।
পরবর্তীতে প্লটটি নিয়মানুযায়ী একাধিকবার হস্তান্তর হয় এবং সর্বশেষ ‘এলিগ্যান্ট ওয়াশিং প্ল্যান্ট লিমিটেড’-এর নামে মালিকানা ও নামজারি সম্পন্ন হয়। সেখানে ১০ তলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউক নকশাও অনুমোদন করে।
এদিকে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার প্লটটির বরাদ্দ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন রিট করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন জমির পাশের এই প্লটটি দীর্ঘদিন খালি ছিল এবং সেখানে ওয়াসার পাম্পসহ অন্যান্য স্থাপনা ছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট বিধিমালা ছাড়া এবং উন্মুক্ত দরপত্র বা বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এ বিকল্প বরাদ্দ বেআইনি। পরবর্তীতে রিটকারীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা মামলাটি পরিচালনা করেন।
১. আইনজীবী হিসেবে সীমাহীন রিট করার অধিকার নেই:
আদালত বলেন, একজন ব্যক্তি আইনজীবী হওয়া কিংবা সমাজে আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাধারণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করার অর্থ এই নয় যে তিনি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রশাসনিক কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার সীমাহীন অধিকার লাভ করবেন। এ ধরনের দায়িত্ব একাই রিট দায়েরের প্রয়োজনীয় লোকাস স্ট্যান্ডি (মামলা করার আইনগত অধিকার) প্রতিষ্ঠা করে না।
২. প্রতিবেশী জমির মালিকানার সীমাবদ্ধতা:
হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, কোনো সরকারি জমির সংলগ্ন বা প্রতিবেশী জমির মালিক হলেই সংশ্লিষ্ট প্লটের বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানানোর অধিকার জন্মায় না। এ ধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংশ্লিষ্ট জমিতে রিটকারীর সরাসরি আইনগত স্বার্থ থাকা কিংবা তাঁর কোনো আইনস্বীকৃত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। রিটকারী নিজে বিতর্কিত প্লটের ওপর কোনো স্বত্ব, চুক্তিগত বা আর্থিক অধিকার প্রমাণ করতে পারেননি।
৩. জনস্বার্থ মামলার অপব্যবহার নয়:
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, কেবল ‘জনস্বার্থ’ শব্দের উল্লেখ করলেই কোনো মামলা জনস্বার্থমূলক (PIL) মামলা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। জনস্বার্থে প্রতিকার চাইতে হলে সেখানে প্রকৃত জনস্বার্থ এবং আদালতে আসার ন্যায়সঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য ভিত্তি থাকতে হবে।
৪. পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও ‘অ্যাপ্রোবেট অ্যান্ড রিপ্রোবেট’ নীতি:
আদালত রিটকারীর যুক্তিতে স্ববিরোধিতা তুলে ধরে বলেন, রিটকারী একদিকে সংলগ্ন জমির মালিক হিসেবে প্লটটি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থ দাবি করেছেন, অন্যদিকে একই জমিকে জনসাধারণের উন্মুক্ত স্থান দাবি করে ব্যক্তি বরাদ্দের বিরোধিতা করেছেন। আইন অনুযায়ী কোনো পক্ষ একই সঙ্গে দুই বিপরীত অবস্থান (Approbate and Reprobate) গ্রহণ করে নিজের সুবিধামতো প্রতিকার দাবি করতে পারেন না।
আদালত অভিমত দেন, বিতর্কিত জমিতে রিটকারীর কোনো প্রত্যক্ষ ও বলবৎযোগ্য আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাঁর রিট দায়েরের আইনগত এখতিয়ার (Locus Standi) নেই। ফলে বিকল্প বরাদ্দের গুণাগুণ নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে আদালত ইতিপূর্বে জারি করা রুল খারিজ করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল ঘোষণা করেন। তবে রায়ে কোনো পক্ষকে খরচ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।