
একাধিক মামলার সাজা একসঙ্গে চলবে না আদালতের নির্দেশ ছাড়া: হাইকোর্ট
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা: আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া একাধিক ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা একই সঙ্গে চলবে না। একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মামলার সাজা কার্যকর হবে—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
চেক ডিজঅনারের পৃথক ছয়টি মামলায় দণ্ডিত ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিনকে কারাগারে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের রুল খারিজ করে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট এ রায় দেন।
সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
মামলাটি ‘মো. নাসির উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র’ নামে পরিচিত।
হাইকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছে
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি একাধিক পৃথক ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হলে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত যদি স্পষ্টভাবে নির্দেশ না দেন যে সাজাগুলো একই সঙ্গে চলবে, তাহলে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, এক মামলার সাজা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মামলার সাজা শুরু হবে।
এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ও ৩৯৭ ধারার বিধান গুরুত্বপূর্ণ বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছয়টি চেক ডিজঅনার মামলায় দণ্ড
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা ছয়টি পৃথক চেক ডিজঅনার মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন।
২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
নাসির উদ্দিনের দাবি ছিল, মামলা বিচারাধীন থাকার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় সাজা হলেও সেই কারাভোগের সময় যথাযথভাবে সাজা থেকে সমন্বয় করা হয়নি।
কেন হাইকোর্টে রিট?
সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন নাসির উদ্দিন।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়।
রুলে জানতে চাওয়া হয়, সাজা ভোগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাকে কারাগার থেকে মুক্তি না দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।
রিটকারীর আইনজীবীর যুক্তি
রুলের শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী মো. শাহ আলম যুক্তি দেন, বিচার চলাকালে নাসির উদ্দিন কারাগারে ছিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার অধীনে ওই কারাভোগের সময় সাজা থেকে সমন্বয় করলে তার সাজা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
তাই তাকে কারাগারে আটকে রাখার আইনগত ভিত্তি নেই এবং মুক্তি দেওয়া উচিত বলে তিনি দাবি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
অন্যদিকে বিবাদীদের পক্ষে আইনজীবী সামীর সাত্তার বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলে আদালত যদি স্পষ্টভাবে সাজা একই সঙ্গে চলার নির্দেশ না দেন, তাহলে সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচারিক আদালতগুলো নাসির উদ্দিনের পৃথক মামলার রায়ে সাজা একই সঙ্গে চলার কোনো নির্দেশ দেননি।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিচারাধীন অবস্থায় কোনো মামলায় ভোগ করা কারাভোগের সময় অন্য মামলার সাজা কমানোর জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
৩৫এ ও ৩৯৭ ধারার ব্যাখ্যা
হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার অধীনে বিচার চলাকালে আসামি যে নির্দিষ্ট মামলায় কারাভোগ করেছেন, সেই মামলার সাজা থেকে ওই সময়ের কারাভোগ সমন্বয় করা যাবে।
অন্যদিকে, পৃথক মামলায় দেওয়া সাজা একই সঙ্গে চলবে কি না, সে বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে।
আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে পৃথক মামলার সাজা একটির পর একটি বা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
রিট এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছে আদালত
রায়ে হাইকোর্ট আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ না করা হলে রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার সুযোগ নেই।
একইভাবে, রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করে বিচারিক আদালতের দেওয়া ফৌজদারি রায়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগও সীমিত।
এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট রিটে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।
আইনি তাৎপর্য
হাইকোর্টের এই রায় একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা গণনা, কারাভোগের সময় সমন্বয় এবং একই সঙ্গে সাজা চলার নির্দেশনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ব্যাখ্যা সামনে এনেছে।
বিশেষ করে, একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা একই সঙ্গে চলবে কি না—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ে স্পষ্ট নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা এ রায়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট মামলায় সাজা কীভাবে গণনা হবে, তা সংশ্লিষ্ট মামলার রায়, দণ্ডের ধরন, প্রযোজ্য আইন এবং আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।