শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৫ অপরাহ্ন
Title :
আদালতের দায়িত্ব পালনকালে আইনজীবীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার আদালত অবমাননার শামিল: এলাহাবাদ হাইকোর্ট সৌদিতে কথিত অপরাধে ত্বরিত ফাঁসি, নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ ও হত্যার বেলায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি স্পষ্ট কারণ ছাড়া পক্ষ সংযোজনের আদেশ আইনসম্মত নয়: হাইকোর্ট ধর্ম অবমাননার অপবাদ ও ফেসবুক উসকানি: হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা কামিল পাস শামীমকে পেশার প্রতি ভালোবাসাই আইনজীবীর সবচেয়ে বড় শক্তি বয়স বাড়ে, শরীরের গতি কমে—কিন্তু শেখার আগ্রহ ও ন্যায়বোধ যেন থেমে না যায়।  কক্সবাজারে সন্তান হারানো নিউজিল্যান্ডের পরিবার ৫০ দিন পর ছাড়লো বাংলাদেশ: নৌযানডুবি ও ডাকাত হামলার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বিদায় শেকৃবির গবেষণা মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রতিবাদে ফের আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন।  দুজন স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট সনদ হওয়ার পর, দক্ষতা ও সততাই নতুন আইনজীবীর পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তি ধানমন্ডির ফুটপাতে বয়স্ক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মারধর ভাইরাল ভিডিওর ঘটনায় যুবক আটক

সৌদিতে কথিত অপরাধে ত্বরিত ফাঁসি, নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ ও হত্যার বেলায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৭ বার পড়া হয়েছে
  • ​সৌদিতে কথিত অপরাধে ত্বরিত ফাঁসি, নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ ও হত্যার বেলায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি

​বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আদালত বার্তা ডেস্কঃ১৭ অক্টোবর ২০২৬। 

​সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় একটি মসজিদের ভেতর কথিত ‘অনৈতিক কাজ’ বা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে অতি সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কিংবা আইনি সহায়তার কোনো সুষ্ঠু সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে অবহিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

​এক পাকিস্তানি নাগরিকের মোবাইল ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে শরিয়া আদালতের দ্রুততম সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিদের এই চরম দণ্ড কার্যকর করার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের বড় প্রশ্ন—যে দেশে কথিত অনৈতিকতার দায়ে বিদেশি নাগরিকের জীবনের অবসান ঘটাতে বিচার বিভাগের একদিনও কালক্ষেপণ হয় না, সেই একই দেশে যুগের পর যুগ ধরে শত শত প্রবাসী নারী গৃহকর্মীর ওপর চলা যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, পৈশাচিক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি আইনের কঠোরতা কোথায় গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে?

​পরিসংখ্যানের ভয়াল চিত্র: ফিরছে রিক্তহস্ত নারী ও কফিনের মিছিল

​আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM), ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং সরকারি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নথি ঘেঁটে পাওয়া তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘কাফালা’ দাসত্ব প্রথার শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হচ্ছেন নারী গৃহকর্মীরা।

  • ​গণ-প্রত্যাবর্তন ও নির্যাতন: ২০১৮-১৯ সালেই সৌদি আরব থেকে বাধ্যতামূলক বা নির্যাতনের মুখে ফিরে এসেছেন ২,৩১৫ জন বাংলাদেশি নারী শ্রমিক। তাঁদের সিংহভাগই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
  • ​শারীরিক ও যৌন সহিংসতার হার: ব্র্যাকের একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ২০১৯ সালের আগস্টে ফেরত আসা ১১০ জন নারীর ৩৫ শতাংশই ছিলেন সরাসরি যৌন বা গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের শিকার। একই সঙ্গে ৩৮ জন দুই ধরনের নির্যাতনের শিকার হন এবং ৪৮ জন এক পয়সাও বেতন না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরেছেন।

  • ​লাশের দীর্ঘ সারি: ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৪৭৩ জন নারীর নিথর মরদেহ দেশে পৌঁছায়, যার মধ্যে ১৭৫টি কফিন আসে কেবল সৌদি আরব থেকে। এর মধ্যে অন্তত ৮১ জন নারী সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

  • ​আত্মহত্যার নেপথ্যে নির্যাতন: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সৌদি আরবে মারা যাওয়া অন্তত ৬৬ জন বাংলাদেশি নারীর মধ্যে ৫২টি মৃত্যুই ছিল আত্মহত্যা। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর আটকে রেখে পাশবিক যৌন নির্যাতন ও মানসিক পীড়নই এই নারীদের আত্মহননে বাধ্য করেছে।

​জীবন্ত বিভীষিকা: ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি

​সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আইনের ছায়ায় কী চলে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য মিলেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে।

​আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতা:

২০১৯ সালে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে আমেনা বেগমের কথা। তিনি রিয়াদে প্রায় দেড় বছর ছিলেন, যার ৫ মাস কেটেছে সৌদি পুলিশের হেফাজতে।

আমেনা জানান, গৃহকর্তার অবৈধ যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে টানা তিন দিন অনাহারে রাখা হয়। পিটিয়ে হাত ভেঙে দিয়ে রাতে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়ার পর আবারও সেই নির্যাতনকারী গৃহকর্তার ঘরেই ফেরত পাঠায়। এরপর আবার শুরু হয় ধর্ষণ ও নির্যাতন। এক বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন মাত্র দুই মাসের, তা-ও আংশিক। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় রিক্তহস্তে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবের কোনো আদালত সেই ধর্ষক নিয়োগকর্তাকে কাঠগড়ায় তোলেনি।

​খুলনার সালমার বোনের করুণ পরিণতি:

সৌদি আরবে গৃহকর্তার পাশবিক নির্যাতনে খুলনার সালমা বেগমের ছোট বোনের মৃত্যু হয়। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটি সৌদির এক থানায় পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সৌদি পুলিশ কোনো আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো নির্যাতনকারী পরিবারের হাতেই তাকে তুলে দেয়। পরবর্তীতে ওই বাসায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সালমা বেগম জানান, মার্চের ৪ তারিখে তাঁর বোন মারা গেলেও লাশ দেশে আসে ২০ জুলাই। সৌদি কর্তৃপক্ষের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছিল ‘হৃদরোগ’। অথচ কফিন খোলার পর দেখা যায় মাথার পেছনের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ এবং সারা শরীরে ছিল ভোঁতা অস্ত্রের পৈশাচিক আঘাতের চিহ্ন।

​এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, আফ্রিকার শ্রমদাসদেরও একই নিয়তি

​২০২৫ সালে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে সৌদি আরবের দাসত্বসুলভ শ্রমব্যবস্থার আরেক অন্ধকার দিক।

  • ​কেনিয়ার শ্রমিকদের মৃত্যুমিছিল: প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, সৌদি আরবে পাঁচ বছরে কেনিয়ার অন্তত ২৭৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন, যাঁদের সিংহভাগই নারী। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অমান্য করে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’, ‘ট্রমা’ বা অস্পষ্ট ‘ব্রেন ডেড’ লিখে দায় সারা হয়েছে।
  • ​ইউনাইস আচিয়েং-এর হত্যাকাণ্ড: কেনিয়ার গৃহকর্মী ইউনাইস আচিয়েং ২০২২ সালে বাড়ি ফোন করে জানিয়েছিলেন, নিয়োগকর্তা তাঁকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে এবং পানির ট্যাংকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর কিছুদিন পর বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংক থেকে আচিয়েংয়ের পচা-গলিত লাশ মেলে। অথচ সৌদি পুলিশ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে নথিপত্রে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে লিপিবদ্ধ করে।
  • ​উগান্ডার আয়েশা মেমের ওপর বর্বরতা: আয়েশা মেমে নামের এক গৃহকর্মী মারা যাওয়ার পর তাঁর স্বামী ইসিকো মোসেসকে সৌদি নিয়োগকর্তা প্রস্তাব দেয়—হয় বকেয়া ২,৮০০ ডলার নেওয়া যাবে, না হয় লাশ ফেরত দেওয়া হবে। ময়নাতদন্তে আয়েশার শরীরে ছিল ব্যাপক নির্যাতন, ৩টি পাঁজর ভাঙা এবং হাত-পা ও কানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে পুড়িয়ে ফেলার দাগ। এই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের পরও সৌদি শরিয়া আদালত বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

কার জন্য এই আইন?

​ইসলামি শরিয়াহ আইনের মূল ভিত্তি হলো সুবিচার, ইনসাফ ও দুর্বলকে জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করা। ইসলামের আইনে ধর্ষণ ও বিচারহীন হত্যাকাণ্ডকে অন্যতম প্রধান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সৌদি আইনে হত্যার বিপরীতে ‘দিয়াত’ (ব্লাড মানি বা রক্তপণ) ও ‘কিসাস’ (মৃত্যুদণ্ড)-এর বিধান রয়েছে।

​তাহলে প্রশ্ন জাগে:

১. যে শরিয়া আইনের অজুহাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দ্রুততম সময়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই একই আদালত বা বিচারিক অবকাঠামো শত শত বিদেশি নারী শ্রমিকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিশ্চুপ কেন?

২. গৃহকর্তারা যখন দিনের পর দিন গৃহকর্মীদের ক্রীতদাসের মতো নির্যাতন করে হত্যা করে, তখন ‘কিসাস’ বা ব্লাড মানির আইন কার স্বার্থে লুকিয়ে রাখা হয়?

৩. কোনো সৌদি নাগরিক কি আজ পর্যন্ত কোনো বিদেশি দরিদ্র নারী গৃহকর্মীকে ধর্ষণ বা পিটিয়ে মারার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে?

​বাস্তবতা হলো, কাফালা ব্যবস্থার কারণে গৃহকর্মীরা আইনি ভাষায় ‘ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তির’ মতো আচরণ পান। মামলা করার অধিকার তো দূরের কথা, পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের কার্যত অবরুদ্ধ রাখা হয়। পুলিশে গেলে অনেক সময় উল্টো তাঁদেরকেই গৃহকর্তার হাতে তুলে দেওয়া হয় অথবা ‘পলায়ন’ বা অনৈতিকতার মামলায় জেলে পোরা হয়।

​সৌদি আরবের কথিত বিচারব্যবস্থা যেন কেবল দুর্বল, দরিদ্র ও তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসীদের দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনৈতিকতার নামে ক্যামেরা ফুটেজ দিয়ে মুহূর্তেই বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সৌদি কর্তৃপক্ষ যখন নিজ দেশের নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত শত শত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে চোখ বুজে থাকে, তখন প্রমাণিত হয়—সেখানে আইনের শাসন নয়, চলছে সুবিধাবাদী শ্রেণি ও জাতীয়তার দম্ভ।

​আর কত কফিন ফিরলে, কত শত নারী সম্ভ্রম হারিয়ে দেশে ফিরলে বিশ্ব সম্প্রদায় এবং মুসলিম বিশ্বের নীতিপ্রণেতাদের বিবেক জাগ্রত হবে? ইনসাফের মুখোশ পরে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতে স্পষ্টতই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট