
খালাস পাওয়ার পরও ৮ বছর কারাগারে: ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হাইকোর্টের রুল
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা, ঢাকাঃ২৮ সেপ্টেম্বর:
সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এবং হাইকোর্ট থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ার পরও শুধু আদেশের কপি না পৌঁছানোয় দীর্ঘ ৮ বছর অতিরিক্ত কারাভোগ করেছেন খুলনার বটিয়াঘাটার ইব্রাহিম শেখ। এই অমানবিক ঘটনার প্রেক্ষিতে তাকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
আদালত সূত্রে জানা যায়, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ পেশায় একজন নৈশপ্রহরী ছিলেন। ২০০৩ সালে রাতের পাহারা শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তিনি বিচারিক আদালতে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। পরবর্তীতে দায়রা আদালত একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই হাইকোর্ট তাকে উভয় মামলা থেকেই বেকসুর খালাস দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তদবিরের অভাবে হাইকোর্টের সেই খালাসের আদেশের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে দীর্ঘ আট বছর।
২২ বছরের কারাবাস ও হারানো জীবন
বিনা অপরাধে অতিরিক্ত আট বছরসহ মোট ২২ বছর জেলে থাকার কারণে ইব্রাহিমের জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। জেলে থাকাকালীন তার মায়ের মৃত্যু হয় এবং স্ত্রী তাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। দীর্ঘ কারাবাস ও মানসিক যন্ত্রণায় ইব্রাহিম শেখ বর্তমানে শারীরিকভাবে চরম অসুস্থ। চরম দারিদ্র্যের কারণে তিনি ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও নিতে পারছেন না।
রিট দায়ের ও শুনানি
সম্প্রতি ইব্রাহিমের এই করুণ পরিণতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা হয়। মানবিক বিবেচনায় ইব্রাহিম শেখকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, পূর্ণ পুনর্বাসন, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। সংগঠনের পক্ষে রিট আবেদনটি করেন গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ হাসান শহিদ কারুজ্জামান এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক।
রুলে যা বলেছেন হাইকোর্ট
রিটকারী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক জানান, ইব্রাহিম আলী শেখের খালাসের আদেশ দীর্ঘ আট বছর ধরে প্রেরণ ও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলা কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চেয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এই ঘটনাকে সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে কেন ঘোষণা করা হবে না— বিবাদীদের কাছে তারও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ বেআইনি আটকের কারণে ইব্রাহিম আলী শেখের
স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জীবিকা হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কেন তাকে অবিলম্বে ৫ কোটি টাকা বা দৃষ্টান্তমূলক কোনো অঙ্ক প্রদান করা হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে।