

আদালত বার্তা ডেস্কঃ ২৯ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ২৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
নৌ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে নদী থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। মরদেহের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও হাতঘড়ির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তাহসিফ সৌরি রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকায় বসবাস করতেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি গত মঙ্গলবার রাতে নিখোঁজ হন। তবে তিনি কীভাবে বা কার সঙ্গে ওই এলাকা থেকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে পৌঁছালেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই ভিডিও ধারণের সঙ্গে তৎকালীন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির নাম আলোচিত হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ভিডিওটি তিনিই ধারণ করেছিলেন, এমন দাবির পক্ষে বর্তমানে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রামাণ্য নথি বা সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। কালবেলাও তাদের প্রতিবেদনে বিষয়টি ‘আলোচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাদের হাতে নেই।
এই কারণে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ৫ আগস্টের ভিডিওর কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো সাংবাদিকতাগতভাবে সমীচীন নয়।
তাহসিফ সৌরির বিমানবাহিনী থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রতিবাদলিপিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরিকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।
অতএব, তাহসিফের চাকরি ছাড়ার ঘটনাকে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মতো তথ্যও বর্তমানে যাচাইযোগ্যভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। একটি প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে; তবে সেটিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এখানে তদন্তের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—
প্রথমত, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফ কোথায় ছিলেন এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর থেকে রাজাবাড়ী ঘাট পর্যন্ত তাঁর যাতায়াতের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা ডিজিটাল ট্রেইল রয়েছে কি না।
তৃতীয়ত, তাঁর মোবাইল ফোনের কললিস্ট, মেসেজ, লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য থেকে নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় কি না।
চতুর্থত, ময়নাতদন্তে শরীরে আঘাতের চিহ্ন, পানিতে ডোবার লক্ষণ বা মৃত্যুর আগে অন্য কোনো আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
পঞ্চমত, তাঁর মৃত্যুর আগে বা পরে কোনো ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না এবং তাঁর ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে সাম্প্রতিক কোনো বিরোধ বা হুমকি ছিল কি না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে যুক্ত করে নানা বক্তব্য ছড়াচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুলিশ, নৌ পুলিশ কিংবা কোনো সরকারি তদন্তকারী সংস্থা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, যার ভিত্তিতে এ ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বা গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশন হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়।
এমনকি বর্তমানে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতেও তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ৫ আগস্টের ভিডিওর সম্পর্কের কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই বিষয়টিকে ‘রহস্যজনক মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
তাহসিফ সৌরি কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন—এই প্রশ্নটির উত্তরই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি নিজে নদীতে গিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়েছিলেন, নাকি অন্য কেউ তাঁকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল—ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সমন্বিত বিশ্লেষণেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
বিশেষ করে তিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি আলোচিত ঘটনার ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাঁর নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকায় তদন্তে কোনো পূর্বধারণা না নিয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধান প্রয়োজন।
একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার নিখোঁজ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। একই সঙ্গে তাঁর নাম অতীতে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনার ভিডিও ধারণের সঙ্গে আলোচিত হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে মানুষের কৌতূহল আরও বেড়েছে।
তবে কৌতূহল এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়। হত্যাকাণ্ড, গুপ্তহত্যা কিংবা দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক শক্ত প্রমাণ। ময়নাতদন্ত, সুরতহাল প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, কল রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ—সবকিছুর সমন্বিত ফলাফলই প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে।
তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত অপরাধ—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী করা বা ঘটনাটিকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।