শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন
Title :
“ওকালতি পেশার মূলমন্ত্র হলো গুরু শিক্ষা” আইনজীবীর মাথা ফাটানো বিচারককে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার উদ্যোগ ঢাকার ৪১৬ বছরপূর্তি উপলক্ষে  ‘হৃদয়ে ঢাকা’ কর্মসূচিতে ঐতিহ্য ও নাগরিক চেতনার নতুন উদযাপন আইনজীবীর মাথায় পেপার ওয়েট ছুড়ে বিচারিক ক্ষমতা হারালেন সেই বিচারক যে কারণে পদত্যাগ করতে হচ্ছে রাষ্ট্রপতিকে, জানা গেল কারণ এক বছরে ২৫ লাখে মামলা কমানোর চেষ্টা সরকারের: আইনমন্ত্রী আলোচনায় হাসিনার দেশে ফেরা চলছে নানা গুঞ্জন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন না, জানালো ইসি  সাংবাদিকতার পেশায় আইনি জ্ঞান ও পেশাগত দায়বদ্ধতা: সত্য অনুসন্ধানের অপরিহার্য ভিত্তি এমপি নজরুল ইসলামের আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে, অবশেষে যে সিদ্ধান্ত নিলো জামায়াত

“ওকালতি পেশার মূলমন্ত্র হলো গুরু শিক্ষা”

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ওকালতি পেশার মূলমন্ত্র হলো গুরু শিক্ষা”

এডভোকেট মোহাম্মদ এনামুল হক সম্পাদক আদালত বার্তাঃ২৪ জুলাই ২০২৬
​ওকালতি (Advocacy) কেবল কোনো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি অনন্য ও সুপ্রাচীন পেশা। আইনের একাডেমিক ডিগ্রি বা তত্ত্বীয় জ্ঞান আদালতকক্ষে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নির্ভর করে বাস্তবিক অভিজ্ঞতার ওপর। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রাথমিক ও প্রধান মাধ্যম হলো একজন অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর (Senior Advocate) অধীনে কাজ করা, যাকে ঐতিহ্যগতভাবে “গুরু শিক্ষা” বা শিক্ষানবিসি (Apprenticeship) বলা হয়।
​“ওকালতি পেশার মূলমন্ত্র হলো গুরু শিক্ষা” — এই কথাটি কেবল সামাজিক অনুভূতির কথা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আইন কাঠামোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি।
আইনগত ভিত্তি ও বাধ্যবাধকতা
​বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘গুরু শিক্ষা’ বা শিক্ষানবিসি কেবল একটি নৈতিক চর্চা নয়, এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
​দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ (President’s Order No. 46 of 1972):
বাংলাদেশের আইনি পেশাকে পরিচালনা করে এই অধ্যাদেশ। বার কাউন্সিলের বিধিমালার অধীনে একজন আইন স্নাতককে সরাসরি আইন পেশায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না।
​বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিসি (Apprenticeship Period):
একজন সনদপ্রার্থীকে কমপক্ষে ১০ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সিনিয়র আইনজীবীর অধিনে ন্যূনতম ৬ মাস শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করার প্রমাণ বা ‘পুপিলশিপ সাটির্ফিকেট’ জমা দিতে হয়।
​এক্ষেত্রে একজন সিনিয়র আইনজীবীর দায়বদ্ধতা:
কোনো জুনিয়র আইনজীবী কোন চেম্বারে কাজ শিখছেন তা বার কাউন্সিলকে ‘ইন্ট্রিমিশন ফর্ম’ (Intimation Form)-এর মাধ্যমে শুরুতেই অবহিত করতে হয়। অর্থাৎ, আইন নিজেই একজন ‘গুরু’ বা একজন সিনিয়র আইনজীবীর অধীনে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে।
​কেন গুরু শিক্ষা অপরিহার্য?
​আইন বিষয়ের ডিগ্রি একজন শিক্ষার্থীকে ‘আইন কী’ (What the law is) তা শেখায়, কিন্তু ‘আইন কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়’ (How the law is applied) তা শেখায় গুরু বা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সান্নিধ্য।
অ্যাডভোকেসি স্কিল ও কেস প্রিপারেশন
​আদালতে কীভাবে আর্জি (Plaint) বা জবাব (Written Statement) খসড়া করতে হয়, জবানবন্দি ও জেরার (Cross-Examination) কৌশল কীভাবে খাটাতে হয়—এগুলো কোনো বই পড়ে পুরোপুরি শেখা সম্ভব নয়। একজন জুনিয়র তার সিনিয়রের মামলা পরিচালনার ধরন দেখে দেখে এই কৌশলগুলো শিখেন ।
কোর্ট ইটিকেট বা আদব-কায়দা
​আদালত কক্ষের নিজস্ব মর্যাদা, শারীরিক ভাষা (Body Language), বিচারকের সামনে উপস্থাপনার ধরণ এবং প্রতিপক্ষ আইনজীবীর সাথে পেশাদার আচরণ—এই শিষ্টাচারগুলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রের দিকনির্দেশনা ছাড়া শেখা অসম্ভব।
​ বার কাউন্সিল পেশাগত আচরণবিধি (Canons of Professional Conduct and Etiquette)
​বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আচরণবিধিতে ৪টি প্রধান বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে:
​আদালতের প্রতি আইনজীবীর দায়িত্ব।
​মক্কেলের প্রতি দায়িত্ব।
​সাধারণ জনগণের প্রতি দায়িত্ব।
​অন্যান্য আইনজীবীদের প্রতি দায়িত্ব।
​সিনিয়রের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করার মাধ্যমেই একজন জুনিয়র আইনজীবী বোঝেন কীভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of interest) এড়িয়ে যেতে হয় এবং কীভাবে মক্কেলের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হয়।
​বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘গুরু শিক্ষা’র গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ
​বর্তমানে দেশে হাজার হাজার তরুণ আইনজীবী আইন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তবে গুরু শিক্ষার এই ঐতিহ্যবাহী ধারণায় কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে:
​চেম্বার ব্যবস্থাপনার অভাব: অনেক সময় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা জুনিয়রদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়াটাও কমে গেছে।
​সম্মানি ও কাঠামোগত দুর্বলতা: শিক্ষানবিস পর্বে নির্দিষ্ট সম্মানির আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক তরুণ আইনজীবী হতাশার মুখোমুখি হন।
​প্রযুক্তির প্রভাব: তথ্যপ্রযুক্তি ও অনলাইন লিগ্যাল রিসার্চের যুগে জ্যেষ্ঠদেরও যেমন নতুন প্রযুক্তি শিখতে হচ্ছে, তেমনি তরুণদেরও ঐতিহ্যগত বিচারিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধা ধরে রাখতে হচ্ছে।
ওকালতি পেশায় তত্ত্বীয় শিক্ষাকে ব্যবহারিক বিচারে রূপান্তর করার একমাত্র সেতু হলো “গুরু শিক্ষা”। এটি ছাড়া আইন পেশায় কোনো আইনজীবীর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
​পেশাগত মান বাড়াতে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
​প্রাতিষ্ঠানিক মেন্টরশিপ: বার কাউন্সিল কর্তৃক গুরু-শিষ্য বা সিনিয়র-জুনিয়রের মেন্টরশিপ প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করা।
​নিয়মিত কর্মশালা: জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত কেস ড্রাফটিং ও ট্রায়াল প্র্যাকটিসের কর্মশালার আয়োজন করা।
​শিক্ষানবিসদের সহায়তা: নবীন আইনজীবীরা যাতে গুরুর কাছ থেকে শেখার পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তায় না ভোগেন, তার জন্য একটি নূন্যতম ভাতা ব্যবস্থা জোরদার করা। তার সাথে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলও শিক্ষানবিশ এবং জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধার প্রদানের জন্য কি কি করা যায় সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
​সেই লক্ষ্যে ওকালতি পেশার উৎকর্ষ, নীতি ও মর্যাদা বজায় রাখার ক্ষেত্রে “গুরু শিক্ষা” বাক্যটি কেবল একটি প্রথা নয়, এটি আইন পেশার অস্তিত্ব ও সাফল্যের অন্যতম মূলমন্ত্র। 

 

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews