সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২০ অপরাহ্ন
Title :
দেনমোহর আদায়ের নীতিমালা তৈরি করতে হাইকোর্টের রুল চট্টগ্রামে দাফনের মাটিটুকুও গিলে খেয়েছে বন্যা পানিতে ভাসছে অবুঝ শিশু থেকে গবাদিপশু নারী মরদেহের পোস্টমর্টেমে নারী ডোম নিয়োগ চেয়ে হাইকোর্টে রিট ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা: বাস্তবতার স্বীকারোক্তি, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতার গ্রহণযোগ্যতা? বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল, তোপের মুখে বালেন্দ্র শাহ UD Case মানেই হত্যা নয়: অপমৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে আইনের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে সুব্রত-তারিক রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আইন অঙ্গনের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের প্রয়াণে শোকের ছায়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয়ে সম্প্রীতির আলোকবর্তিকা: গুরুদুয়ারা নানকশাহী

চট্টগ্রামে দাফনের মাটিটুকুও গিলে খেয়েছে বন্যা পানিতে ভাসছে অবুঝ শিশু থেকে গবাদিপশু

  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামে দাফনের মাটিটুকুও গিলে খেয়েছে বন্যা
পানিতে ভাসছে অবুঝ শিশু থেকে গবাদিপশু
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম,আদালত বার্তাঃ১৩ জুলাই 
অতিবৃষ্টির অবিরাম ধারা আর পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি, যেখানে শুধু ঘরবাড়ি নয়—কবরস্থানের মাটিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে স্বজন হারানোর বেদনার মধ্যেও প্রিয়জনদের দাফন করার মতো শুকনো মাটি পাচ্ছেন না মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত প্লাবিত হয়ে পড়ে। নগরীর পাশ্ববর্তী হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালীসহ একাধিক এলাকায় ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্র দেখা গেছে গ্রামাঞ্চলে। পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, এমনকি অসহায় শিশুদেরও উদ্ধার করতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনরা। অনেক পরিবার গাছের ডাল বা উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। নিরাপদ পানীয় জল ও খাবারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমার বৃদ্ধ বাবার মৃত্যু হয়েছে গতকাল। কিন্তু তাকে দাফন করার মতো একটুকরো শুকনো মাটিও পাইনি। বাধ্য হয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে দূরের একটি উঁচু স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে।” এই চিত্রই যেন এখন চট্টগ্রামের বহু পরিবারের বাস্তবতা।
প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে দুর্গতদের উদ্ধারে কাজ করছে। তবে দুর্গম এলাকা এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন আকস্মিক ও তীব্র বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-বিল ভরাট এবং পাহাড় কাটা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রামের ইতিহাসে বন্যা একটি পুরনো ও পুনরাবৃত্তিমূলক সমস্যা। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান (পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের সংযোগস্থল) এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে এখানে প্রায় প্রতি বছর জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা যায়। পাহাড়ি ঢল, কর্ণফুলী নদীর জোয়ার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এটিকে আরও তীব্র করে।
উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক বন্যা ও দুর্যোগের ঘটনা
১৯৮৮ সালের বন্যা: বাংলাদেশের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা। চট্টগ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্য খাতে। পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়া এবং পশুপাখির ক্ষতির বড়। 
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস: চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী। প্রায় ১.৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এটি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সমন্বিত প্রভাব দেখায়।
২০০৭ সালের ভূমিধস: টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ১২০+ জনের মৃত্যু। পাহাড়ধস চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বিবেচিত হয়।
২০০৪, ২০০৭, ২০১৯, ২০২৩: পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি) ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে বড় বন্যা ও পাহাড়ধস।
সাম্প্রতিক ঘটনা (২০২৬)
২০২৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে ৪২-৪৩ বছরের রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয় (২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার)।

এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগড়া, বাঁশখালীসহ অনেক উপজেলা প্লাবিত।
লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত।
পাহাড়ধস ও বন্যায় কয়েক ডজন মৃত্যু।
মৎস্য খাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি (হাজার হাজার পুকুর-ঘের ভেসে গেছে)।
কারণসমূহ
প্রাকৃতিক: ভারী মৌসুমি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল (সাঙ্গু, ডলু, কর্ণফুলী নদী), জোয়ার।
মানুষসৃষ্ট: পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নালা-খালের সংকোচন। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় প্রকল্প চললেও বাস্তবায়ন ধীরগতির।
চট্টগ্রামের বন্যা শুধু কৃষি-জীবন নয়, অর্থনীতি (বন্দর) ও পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর তীব্রতা বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

মানবিক বিপর্যয়ের এই চিত্র শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়—এটি আমাদের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও নির্মম প্রতিচ্ছবি।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews