
আদালত বার্তা ডেস্ক,রামপাল (বাগেরহাট):
তিন দশকের প্রতীক্ষা আর দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেগা প্রকল্প ‘খানজাহান আলী বিমানবন্দর’। খুলনা ও বাগেরহাটবাসীর বহু আকাঙ্ক্ষিত এই বিমানবন্দর বাস্তবায়নে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন’ (সিএমসি) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে খুলনা-মোংলা মহাসড়ক সংলগ্ন রামপালের ফয়লা এলাকায় থমকে থাকা বিমানবন্দর প্রকল্পটিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।
১৯৯৬ সালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ফয়লা এলাকায় তৎকালীন সরকারের সময়ে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। শুরুতে স্বল্প পরিসরে রানওয়ে ও অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ সময়ে তা জমি অধিগ্রহণ ও নামমাত্র মাটি ভরাটের চক্রেই ঘুরপাক খেয়েছে।
পরবর্তী সময়ে এটিকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের আলোচনা ওঠে এবং খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশে প্রায় ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়। কিন্তু তহবিল সংকট, বারবার প্রকল্প সংশোধন এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে একনেক সভায় অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান না পেয়ে প্রকল্পটি কার্যত স্থগিত হয়ে পড়ে। ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষকে আকাশপথে যাতায়াতের জন্য তিন দশক ধরে ভরসা করতে হচ্ছে যশোর (বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান) বিমানবন্দরের ওপর।
সম্প্রতি চীনের প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল রামপালের প্রস্তাবিত বিমানবন্দর এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে। মাটি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কিংবা জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার) কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব বা যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেবিচকের কাছে লিখিত প্রস্তাব পেশ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা যাচাই-বাছাই করছে বলে জানা গেছে।
১. যাতায়াতের ভোগান্তি ও ব্যয় সাশ্রয়:
বর্তমানে খুলনা বা বাগেরহাট থেকে যশোর বিমানবন্দর পৌঁছাতে সড়কপথেই দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় এবং যানজটের কারণে অতিরিক্ত ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকার পরিবহন খরচ গুনতে হয়। ফ্লাইট ধরতে না পারার ঝুঁকি সবসময়ই থেকে যায়। খানজাহান আলী বিমানবন্দর চালু হলে খুলনা থেকে মাত্র ২০-২৫ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাবে এবং আকাশপথে সরাসরি ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
২. মোংলা বন্দর ও শিল্পাঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ:
মোংলা সমুদ্রবন্দর, মোংলা ইপিজেড ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বর্তমানে দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে বিদেশি বায়ার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিনিয়োগকারীরা কোনো সড়ক দুর্ভোগ ছাড়াই সরাসরি শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাতে পারবেন, যা নতুন অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করবে।
৩. চিংড়ি ও পচনশীল পণ্য রপ্তানিতে বৈপ্লবিক গতি:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ‘সাদা সোনা’ খ্যাত গলদা ও বাগদা চিংড়ি। সড়কপথে দীর্ঘ সময় নিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে বিমানে তুলতে গিয়ে গুণগত মান নষ্টের যে ঝুঁকি থাকত, রামপালে এয়ার কার্গো সুবিধা চালু হলে তা সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে তাজা অবস্থায় পাঠানো সম্ভব হবে।
৪. সুন্দরবন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ:
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার এবং ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ ঘিরে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বিমান যোগাযোগ সহজ হলে সুন্দরবন ভ্রমণকারী দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বণ্টন, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনি বিষয়াদি দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। দীর্ঘ ৩০ বছরে জমির মূল্য ও প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। তাই চীনা প্রস্তাবটিকে সময়োপযোগী চুক্তিতে রূপান্তর করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সবকিছু ঠিক থাকলে এবং নীতিগত অনুমোদন দ্রুত মিললে, দীর্ঘ ৩০ বছরের অবহেলা কাটিয়ে মেঘের ডানায় ভাসবে দক্ষিণাঞ্চলের স্বপ্ন—এমনটাই প্রত্যাশা এই অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহলের।