
মিথ্যা মামলা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভুয়া দাবি, জীবিত মানুষকেও দেখানো হয় মৃত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনার অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলার সন্ধান পেয়েছে পিবিআই
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১৩ মে ২০২৬
মায়ের দাবি ছিল, জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে তার ছেলেকে গুলি করা হয়েছে। তিনি বিচার চেয়ে একটি মামলাও করেছিলেন। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে সাজানো হয়েছিল এই মামলা।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক তদন্তে দেখা গেছে, দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীর গায়ে কোনো গুলি লাগেনি। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার এই মামলা করেছিলেন তার মা। অথচ তদন্তে জানা যায়, অন্য একটি জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল ছেলেটি।
আরেকটি মামলায় এক জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে। মামলায় দাবি করা হয়, অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ২০ বছর বয়সী এক তরুণ নিহত হয়েছেন। কিন্তু পিবিআইয়ের তদন্তে দেখা যায়, তিনি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন।
এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন দুটি ঘটনা নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশের আদালতে হওয়া ১৯৫টি সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলার প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই।
পিবিআই সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া মামলা করার পেছনে পূর্বশত্রুতা থেকে শুরু করে পারিবারিক বিরোধের মতো উদ্দেশ্য ছিল। ১৪টি ভুয়া মামলার মধ্যে ১০টি হত্যাচেষ্টা, তিনটি হামলা ও শারীরিক নির্যাতন এবং একটি হত্যার অভিযোগে করা হয়।
এ ছাড়া আরও ১০টি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মো. আবু ইউসুফ গত সপ্তাহে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা বারবার অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখেছি, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাইনি। এসব মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে।’
পিবিআই এখন পর্যন্ত ১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে ১১৩টির তদন্ত শেষ করেছে। এর মধ্যে ৮৯টি মামলার সত্যতা মিলেছে, যার ৯টি হত্যা এবং বাকিগুলো হত্যাচেষ্টার মতো অপরাধ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ৮৯টি মামলায় মোট ৬ হাজার ৮৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত শেষে মাত্র ১ হাজার ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ভুয়া মামলার আসামিরা প্রায়ই হয়রানির মুখে পড়েন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
তিনি বলেন, ‘তাদের ক্ষতিপূরণ হয়তো আমরা দিতে পারব না। তবে দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে আমরা ভুয়া মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারি। জুলাই অভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলাগুলোতে পুলিশ এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের শাস্তির বিষয়ে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা করলে তার দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর মিথ্যা অভিযোগটি যদি গুরুতর অপরাধের হয়, তবে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
জাতিসংঘের এক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ওই সময়ের ঘটনায় চলতি বছরের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলাগুলো পিবিআইসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তদন্ত করছে।
গুলির দাবি, কিন্তু ঘটনা বাইক দুর্ঘটনার
শিহাবের মা ফাতেমা আক্তার পারুল গত বছরের ২১ নভেম্বর একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের গেটের সামনে আসামিরা গুলি ও ককটেল ছুড়লে তার ছেলে শিহাব গুরুতর আহত হয়।
কিন্তু পিবিআইয়ের তদন্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন শিহাবের মোটরসাইকেলের সঙ্গে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়েছিল। আর সেই ঘটনাটি ঘটেছিল অন্য একটি জায়গায় এবং ভিন্ন সময়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে পিবিআই এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হাসপাতাল থেকে পাওয়া চিকিৎসা নথিতেও তার গায়ে কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতের প্রমাণ মেলেনি। তবে তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন যে শিহাব গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
তদন্তে মামলা করার পেছনের আসল উদ্দেশ্যও সামনে আসে। পিবিআই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ ও ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা ইউসুফ আহমদ জনি ৩৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন, যার মধ্যে ইয়াকুব আলী নামের এক আওয়ামী লীগ নেতার নামও ছিল। এই ইয়াকুব আলী হলেন শিহাবের মা পারুলের চাচাশ্বশুর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই পারুল ছাত্রদল নেতা ও অন্যদের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা মামলাটি করেছিলেন।
মামলার এজাহারে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে পারুলের স্বামী শরীফ উদ্দিন ফোন ধরেন। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে সরকারি গেজেটভুক্ত একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ এবং সে ওই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। ছেলের আঘাত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণে হয়েছিল—পিবিআইয়ের এমন দাবি তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, তারা এখনো পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের কপি হাতে পাননি। ‘আমরা এই তদন্ত প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করব,’ বলেন তিনি।
জীবিত মানুষকে দেখানো হলো মৃত
রাজধানীর উত্তরায় ২০ বছর বয়সী এক যুবকের হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই দেখে, ওই যুবক দিব্যি বেঁচে আছেন।
ওই যুবকের মা পারুল খাতুন (৪৫) গত বছরের ২৫ নভেম্বর মিথ্যা মামলা দায়ের করেন।