
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আদালত বার্তা ডেস্কঃ১৭ অক্টোবর ২০২৬।
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় একটি মসজিদের ভেতর কথিত ‘অনৈতিক কাজ’ বা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে অতি সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কিংবা আইনি সহায়তার কোনো সুষ্ঠু সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে অবহিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এক পাকিস্তানি নাগরিকের মোবাইল ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে শরিয়া আদালতের দ্রুততম সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিদের এই চরম দণ্ড কার্যকর করার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের বড় প্রশ্ন—যে দেশে কথিত অনৈতিকতার দায়ে বিদেশি নাগরিকের জীবনের অবসান ঘটাতে বিচার বিভাগের একদিনও কালক্ষেপণ হয় না, সেই একই দেশে যুগের পর যুগ ধরে শত শত প্রবাসী নারী গৃহকর্মীর ওপর চলা যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, পৈশাচিক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি আইনের কঠোরতা কোথায় গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে?
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM), ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং সরকারি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নথি ঘেঁটে পাওয়া তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘কাফালা’ দাসত্ব প্রথার শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হচ্ছেন নারী গৃহকর্মীরা।
সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আইনের ছায়ায় কী চলে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য মিলেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে।
আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতা:
২০১৯ সালে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে আমেনা বেগমের কথা। তিনি রিয়াদে প্রায় দেড় বছর ছিলেন, যার ৫ মাস কেটেছে সৌদি পুলিশের হেফাজতে।
আমেনা জানান, গৃহকর্তার অবৈধ যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে টানা তিন দিন অনাহারে রাখা হয়। পিটিয়ে হাত ভেঙে দিয়ে রাতে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়ার পর আবারও সেই নির্যাতনকারী গৃহকর্তার ঘরেই ফেরত পাঠায়। এরপর আবার শুরু হয় ধর্ষণ ও নির্যাতন। এক বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন মাত্র দুই মাসের, তা-ও আংশিক। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় রিক্তহস্তে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবের কোনো আদালত সেই ধর্ষক নিয়োগকর্তাকে কাঠগড়ায় তোলেনি।
খুলনার সালমার বোনের করুণ পরিণতি:
সৌদি আরবে গৃহকর্তার পাশবিক নির্যাতনে খুলনার সালমা বেগমের ছোট বোনের মৃত্যু হয়। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটি সৌদির এক থানায় পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সৌদি পুলিশ কোনো আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো নির্যাতনকারী পরিবারের হাতেই তাকে তুলে দেয়। পরবর্তীতে ওই বাসায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সালমা বেগম জানান, মার্চের ৪ তারিখে তাঁর বোন মারা গেলেও লাশ দেশে আসে ২০ জুলাই। সৌদি কর্তৃপক্ষের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছিল ‘হৃদরোগ’। অথচ কফিন খোলার পর দেখা যায় মাথার পেছনের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ এবং সারা শরীরে ছিল ভোঁতা অস্ত্রের পৈশাচিক আঘাতের চিহ্ন।
২০২৫ সালে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে সৌদি আরবের দাসত্বসুলভ শ্রমব্যবস্থার আরেক অন্ধকার দিক।
জন্য এই আইন?ইসলামি শরিয়াহ আইনের মূল ভিত্তি হলো সুবিচার, ইনসাফ ও দুর্বলকে জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করা। ইসলামের আইনে ধর্ষণ ও বিচারহীন হত্যাকাণ্ডকে অন্যতম প্রধান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সৌদি আইনে হত্যার বিপরীতে ‘দিয়াত’ (ব্লাড মানি বা রক্তপণ) ও ‘কিসাস’ (মৃত্যুদণ্ড)-এর বিধান রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে:
১. যে শরিয়া আইনের অজুহাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দ্রুততম সময়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই একই আদালত বা বিচারিক অবকাঠামো শত শত বিদেশি নারী শ্রমিকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিশ্চুপ কেন?
২. গৃহকর্তারা যখন দিনের পর দিন গৃহকর্মীদের ক্রীতদাসের মতো নির্যাতন করে হত্যা করে, তখন ‘কিসাস’ বা ব্লাড মানির আইন কার স্বার্থে লুকিয়ে রাখা হয়?
৩. কোনো সৌদি নাগরিক কি আজ পর্যন্ত কোনো বিদেশি দরিদ্র নারী গৃহকর্মীকে ধর্ষণ বা পিটিয়ে মারার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে?
বাস্তবতা হলো, কাফালা ব্যবস্থার কারণে গৃহকর্মীরা আইনি ভাষায় ‘ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তির’ মতো আচরণ পান। মামলা করার অধিকার তো দূরের কথা, পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের কার্যত অবরুদ্ধ রাখা হয়। পুলিশে গেলে অনেক সময় উল্টো তাঁদেরকেই গৃহকর্তার হাতে তুলে দেওয়া হয় অথবা ‘পলায়ন’ বা অনৈতিকতার মামলায় জেলে পোরা হয়।
সৌদি আরবের কথিত বিচারব্যবস্থা যেন কেবল দুর্বল, দরিদ্র ও তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসীদের দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনৈতিকতার নামে ক্যামেরা ফুটেজ দিয়ে মুহূর্তেই বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সৌদি কর্তৃপক্ষ যখন নিজ দেশের নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত শত শত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে চোখ বুজে থাকে, তখন প্রমাণিত হয়—সেখানে আইনের শাসন নয়, চলছে সুবিধাবাদী শ্রেণি ও জাতীয়তার দম্ভ।
আর কত কফিন ফিরলে, কত শত নারী সম্ভ্রম হারিয়ে দেশে ফিরলে বিশ্ব সম্প্রদায় এবং মুসলিম বিশ্বের নীতিপ্রণেতাদের বিবেক জাগ্রত হবে? ইনসাফের মুখোশ পরে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতে স্পষ্টতই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।