
আইনজীবী আসামির পক্ষে—অপরাধের নয়: ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ও পেশাগত দায়িত্ব
প্রতিবেদন,আদালত বার্তাঃ২৭ জুন ২০২৬
সাম্প্রতিক এক আলোচিত মামলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—“এত জঘন্য অপরাধের আসামির পক্ষে একজন আইনজীবী কেন দাঁড়াবেন?” এই প্রশ্নটি আবেগপ্রসূত হলেও এর উত্তর নিহিত রয়েছে আইনের শাসনের মৌলিক দর্শন ও ন্যায়বিচারের কাঠামোর ভেতর।
বিশ্বের সকল আধুনিক বিচারব্যবস্থার মতো বাংলাদেশেও একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠিত—প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন। এই নীতির ভিত্তি শুধু সংবিধানেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও সুপ্রতিষ্ঠিত। “Fair Trial” বা ন্যায্য বিচারের এই ধারণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে তাকে নিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। আর সেই সুযোগ কার্যকর হয় একজন আইনজীবীর মাধ্যমে।
আইনজীবীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, কোনো আসামির পক্ষে দাঁড়ানো মানেই তার অপরাধকে সমর্থন করা। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন আইনজীবীর কাজ হলো তাঁর মক্কেলের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদালতের সামনে যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করা। তিনি বিচারক নন, রায়দাতা নন, শাস্তি নির্ধারকও নন। বিচার করেন আদালত, আইনজীবী নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার এবং নিজের পক্ষে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায়ও একজন আসামির আইনজীবী থাকা অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে, যদি কোনো আসামি নিজে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্র তার জন্য আইনজীবীর ব্যবস্থা করে থাকে—যাকে “State Defense” বা রাষ্ট্রনিযুক্ত প্রতিরক্ষা বলা হয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, যুগে যুগে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত মামলাগুলোতেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যুদ্ধাপরাধের বিচার কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতেও আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। কারণ, বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে উভয় পক্ষের সমান সুযোগের ওপর।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রণীত Canons of Professional Conduct and Etiquette-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—একজন আইনজীবীকে ভয়, জনরোষ, সামাজিক চাপ বা ব্যক্তিগত মতামতের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি তাঁর মক্কেলের পক্ষে সর্বোচ্চ দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মামলা পরিচালনা করবেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; বরং আইন পেশার নৈতিক ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে—আসামিপক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। এটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবমাননা নয়; বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। যদি আইনজীবীরা ভয় বা সামাজিক চাপে পড়ে তাদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন, তবে ন্যায্য বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
ন্যায়বিচারের মূল দর্শন হলো—“Let justice be done, though the heavens fall।” অর্থাৎ, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আর সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে বিচারপ্রক্রিয়াকে হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত।
মনে রাখা জরুরি—
আদালত বিচার করেন, আইনজীবী নন।
আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করেন, রায় দেন বিচারক।
অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেন আদালত, আইনজীবী নন।
অতএব, কোনো আইনজীবীকে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গালিগালাজ করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আমাদের উচিত অপরাধকে ঘৃণা করা, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে ৃসম্মান করা।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক—সে যত বড় অপরাধেই অভিযুক্ত হোক না কেন—ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার ভোগ করে। আবেগ নয়, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই হওয়া উচিত আমাদের সবার অঙ্গীকার।
অপরাধের বিচার হোক কঠোর, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া হোক ন্যায্য ও আইনসম্মত। আইনজীবীকে নয়, অপরাধকে ঘৃণা করুন—এটাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত।