বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন
Title :
৩৮ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি রোধে এনবিআরের নজরে ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স অ্যাক্ট, ২০২৬ বিষয়ে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নামে প্রতারণা: সতর্ক থাকার আহ্বান পুলিশ সদর দফতরের দেশের ১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় রদবদল: ২৫ শীর্ষ পদে নতুন মুখ নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা অসভ্যতা করাকে এখন বাহাদুরি মনে করা হয় : আফজাল হোসেন ইতিহাসের বয়ান, বৈশ্বিক রাজনীতি এবং বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা সাংবাদিকের নিবন্ধন: স্বাধীনতা নাকি নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো? ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি উদ্বিগ্ন নাগরিকদের যৌথ বিবৃতি শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে ঘিরে সামাজিক বিতর্ক ব্যক্তিস্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক মূল্যবোধের নতুন বাস্তবতা ফিটনেস সনদ ছাড়া যানবাহন চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের রুল

৩৮ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি রোধে এনবিআরের নজরে ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার পড়া হয়েছে

৩৮ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি রোধে এনবিআরের নজরে ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ২৯ জুলাই ২০২৬
রাজস্ব ফাঁকির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, এমন ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) স্ক্যানারে আসতে যাচ্ছে, যেখান থেকে বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে বাড়তি ৩৮ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ১০ লাখ টাকার বেশি মাসিক লেনদেন রয়েছে এবং রাজস্বের জন্য জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তথা ফাঁকির প্রবণতা বেশি রয়েছে—মূলত এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এই তালিকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভ্যাট ফাঁকির সন্দেহে থাকা তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানকেও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তবে মূল নজর থাকবে মাঝারি আকারের ব্যবসা ও বড় ভ্যাটদাতাদের ওপর।
এ তালিকায় থাকতে পারে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান যারা বিভিন্ন ধরণের কেনাকাটা করে—যাদের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্থানীয়ভাবে বিক্রি বা সরবরাহের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানসহ ভ্যাট নিবন্ধিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
এ ধরনের প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাদের ফাঁকি উদ্ঘাটনের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে বাড়তি ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায় এনবিআরের ভ্যাট উইং।
এর বাইরে বড় আকারের ভ্যাট প্রদানকারী  প্রতিষ্ঠান, বছরে ১ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দেয় – এমন ২ হাজার প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি উদ্ঘাটনেও বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজস্ব বোর্ড। এসব করদাতার থেকে স্বাভাবিক আদায়কৃত ভ্যাটের বাইরে বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায় এনবিআর।
সব মিলিয়ে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের মাধ্যমে বাড়তি ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। এর বাইরে আরো কিছু ফাঁকি উদ্ঘাটনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বাড়তি আরো তিন হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার এনবিআরে অনুষ্ঠিত এক সভায়, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কাছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ফাঁকি উদ্ঘাটনের মাধ্যমে বাড়তি এ ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে এনবিআর।
প্রয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য
ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে অতিরিক্ত ভ্যাট রাজস্ব হিসেবে ৯৯,০০০ কোটি টাকা—যার মধ্যে ১০,০০০ প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮,০০০ কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত—আদায়ের লক্ষ্য নিয়েছে। তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা, বকেয়া আদায় থেকে ১৪ হাজার  কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন থেকে বাড়তি ১৫ হাজার কোটি এবং ভ্যাট আদায়ে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা আসবে।
প্রসঙ্গত, নতুন অর্থবছরে আয়কর ফাঁকি উদ্ঘাটনেও বিশেষ নজর দিয়েছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের কর কর্তনের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে চলে, তাহলে তাদের নথিপত্র ও কম্পিউটার বাজেয়াপ্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এনবিআর সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যবস্থার কথা প্রকাশ করে।
যদিও এই উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এনবিআরের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, প্রস্তাবিত এ প্রয়োগ (এনফোর্সমেন্ট) ব্যবস্থা অনিশ্চয়তা তৈরির মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।
ভ্যাট পরিপালনে বিশাল ঘাটতি
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসাগুলোর মধ্যে কমপ্লায়েন্স বা পরিপালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি কমানো গেলে বিপুল অঙ্কের বাড়তি ভ্যাট আদায় করা যাবে।
বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, তারা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবস্থার একটি বড় অংশে উল্লেখযোগ্য কমপ্লায়েন্স ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা হিসাব করে দেখেছি যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আছে, সেখানে বড় একটি অংশের মধ্যে কমপ্লায়েন্স গ্যাপ প্রচুর। এসব গ্যাপ কমানো সম্ভব হলে বিশাল অঙ্কের বাড়তি ভ্যাট আদায় করা সম্ভভ হবে।”
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে যে ধরণের গড়মিল রয়েছে, তা ঠিকমত উদ্ঘাটন করা গেলে এই সেক্টর থেকে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হবে। নামকরা একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই কোম্পানির ইতোমধ্যে যে ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন হয়েছে, তার পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে ফাঁকি উদ্ঘাটনে বিশেষায়িত এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম শুরু করেছি। কেবল রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ফাঁকি উদ্ঘাটনে কিছু কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করা হয়েছে।”
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা
চলতি অর্থবছরে সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে প্রায় ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এটিই সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা।
এর মধ্যে একক খাত হিসেবে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি— ৩.২১ লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে ভ্যাট খাত থেকে, যা গত অর্থবছরের আদায়ের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
বর্ধিত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকার গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, যদিও অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায়ে এত দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো জোরালো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব
তবে কর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দ্রুত গতি না এলেও ফাঁকি বন্ধ করার মাধ্যমে এই অতিরিক্ত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “আমাদের অর্থনীতির আকারের কথা বিবেচনায় নিলে, প্রযোজ্য সব ভ্যাট সঠিকভাবে আদায় করা গেলে—ভ্যাট সংগ্রহ বর্তমান মাত্রার অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে।”
এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভ্যাটযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভ্যাট দিচ্ছে না। আবার কিছু  প্রতিষ্ঠান যা ভ্যাট হওয়া উচিত, তার সামান্য অংশ দিচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট নিলেও— তা সরকারের ঘরে দিচ্ছে না।
“এসব অর্থ সঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব হলে ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ভ্যাট আদায় করা সম্ভব” –বলেন তিনি।
তবে তিনি মনে করেন, ফাঁকি উদ্ঘাটনে অটোমেশন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব হলে, তা ভ্যাট ফাঁকি রোধে সবচেয়ে ভালো ফল দেবে। এতে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অহেতুক তল্লাশি চালানো বা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করার প্রয়োজন হবে না।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ, যার মধ্যে ৫ লাখের মত প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেয়। এর মধ্যে আবার বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান জিরো রিটার্ন দেয়, অর্থাৎ কোনো ভ্যাট দায় নেই বলে জানায়।ইনফোগ্রাফি
কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগ স্বীকার করেছেন যে, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট