
৮৬% মামলার তদন্ত ঝুলে আছে: ময়নাতদন্ত সংকট, তথ্যঘাটতি ও ঢালাও আসামির জটিলতা
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অধিকাংশই এখনো তদন্তের পর্যায়ে আটকে আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে দায়ের হওয়া মোট ১,৮৬২টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টির (১৩.৬৪%) তদন্ত শেষ হয়েছে, আর ৮৬.৩৬% মামলার তদন্ত এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে রয়েছে ময়নাতদন্তবিহীন দাফন, তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতি, মামলার অসংগতি, এবং ঢালাওভাবে আসামি করার মতো একাধিক জটিল কারণ—যা তদন্ত কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন: তদন্তে বড় বাধা
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, গণ-অভ্যুত্থানের সময় অনেক মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। ফলে এখন দীর্ঘ সময় পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে ফরেনসিক পরীক্ষা করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
এছাড়া, বহু মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করাও জটিল হয়ে উঠেছে, যা মামলা দায়ের ও তদন্ত উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
তথ্যঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্দোলনের তীব্র সময়ে—বিশেষ করে ১৯ জুলাই এবং ৪-৫ আগস্ট—হতাহতদের বিষয়ে হাসপাতাল, পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি।
ফলে কে কোথায় নিহত হয়েছেন, কীভাবে মারা গেছেন, কিংবা কোথায় দাফন করা হয়েছে—এসব মৌলিক তথ্যের ঘাটতি এখন তদন্তকে দীর্ঘায়িত করছে।
মামলার অসংগতি ও একাধিক মামলা
অনেক মামলায় দেখা গেছে—
একই ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে
ঘটনাস্থলের ভুল বা অস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে
বাদীর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির সম্পর্কের প্রমাণ মেলেনি
এসব কারণে তদন্তকারীদের নতুন করে যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে, যা সময় বাড়াচ্ছে।
ঢালাও আসামি ও হয়রানির অভিযোগ
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদারকি দুর্বল হয়ে পড়লে অনেক মামলায় অসংখ্য নিরীহ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পূর্বশত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগও সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সতর্কীকরণ জারি করে এবং হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পুলিশ সদর দপ্তরও পরে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করে তদন্ত তদারকি শুরু করে।
পরিসংখ্যান: তদন্তের বর্তমান চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—
হত্যা সংক্রান্ত মামলা
মোট মামলা: ৭৯৯টি
মোট আসামি: ৩,২৭,৮৪১ জন
অভিযোগপত্র: ৬৩টি
চূড়ান্ত প্রতিবেদন: ৩৭টি
আহত সংক্রান্ত মামলা
মোট মামলা: ১,০৬৩টি
মোট আসামি: ২,৮২,৮৭৯ জন
তদন্ত সম্পন্ন: ১৫৪টি
অভিযোগপত্র: ১৩৬টি
চূড়ান্ত প্রতিবেদন: ১৮টি
সামগ্রিকভাবে, এখন পর্যন্ত ১৯৯টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষ্যপ্রমাণ সংকট ও রাজনৈতিক প্রভাব
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী, ফলে প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে, কিছু মামলায় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে আসামির তালিকা প্রভাবিত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, আন্দোলনের সময়—
আহতদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়া হয়েছে
অনে
ক মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত হয়নি
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড নষ্ট করা হয়েছে
ফলে বিচার প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণের বড় অংশ এখন অনুপস্থিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতি
গণ-অভ্যুত্থান-সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে ৬টি মামলার রায় দিয়েছে।
এই রায়গুলোতে—
মোট দণ্ডপ্রাপ্ত: ৬১ জন
পলাতক: ৪০ জন
কারাবন্দী: ২১ জন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো পলাতক।
বিশেষজ্ঞ মত: দ্রুত তদন্ত শেষের তাগিদ
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন,
“রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত শেষ করা জরুরি। নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি না করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
তিনি আরও সুপারিশ করেন—
জেলা ও মহানগর পর্যায়ে তদারকি কমিটি গঠন
নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ
তদন্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গণ-অভ্যুত্থানের অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ময়নাতদন্ত সংকট, তথ্যঘাটতি, মামলার অসংগতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এসব জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।