শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন
Title :
সংবিধান প্রণয়ন ও স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনে এক অনন্য রূপকার: এ এইচ এম কামারুজ্জামান আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে মো. হাবিবুল গনির নিয়োগ: কর্মজীবন ও একটি যুগান্তকারী রায়ের পর্যালোচনা আইন পেশায় সফলতার মূলমন্ত্র মেধা, সততা ও পরিশ্রম: নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে আইনমন্ত্রী হিমালয়ের বিপর্যয়: নেপালের আকস্মিক বন্যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে ‘ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড’, চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ভাটির দেশগুলো বিচারক-গাড়িচালকের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ কাপ্তাই হ্রদে জেলেদের প্রাণরক্ষায় ৬৬ বজ্র নিরোধক নিরাপত্তার নতুন উদ্যোগ, তবে প্রয়োজন আগাম সতর্কবার্তাও বাংলাদেশে ঢুকবে নেপালের পাহাড়ি ঢল, দেওয়া হলো পানির গতিপথ নেপালে হঠাৎ প্রলয়ংকরী বন্যা: বৃষ্টি ছাড়াই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে কী? জীবনের অমোঘ চক্র: দোলনা থেকে শূন্যতায় ফেরার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি এআই দিয়ে ভুলেও যে ১১টি কাজ করবেন না প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর ঝুঁকি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রয়োজন মানবিক বিবেচনা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

সংবিধান প্রণয়ন ও স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনে এক অনন্য রূপকার: এ এইচ এম কামারুজ্জামান

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

সংবিধান প্রণয়ন ও স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনে এক অনন্য রূপকার: এ এইচ এম কামারুজ্জামান

মোহাম্মদ এনামুল হক,এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সম্পাদক, আদালত বার্তা

​স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং এর আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের ইতিহাসে যে কয়জন ক্ষণজন্মা পুরুষের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম এ এইচ এম কামারুজ্জামান। তিনি কেবল জাতীয় চার নেতার একজনই ছিলেন না, বরং একাধারে ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ আইনজীবী, দক্ষ প্রশাসক এবং সংবিধান প্রণয়ন কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের আইনগত ভিত্তি তৈরির প্রেক্ষাপটে তার উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার এক অনন্য সংমিশ্রণ।

​শেকড়, শিক্ষা এবং আইন পেশায় আত্মনিয়োগ

১৯২৩ সালের ২৬ জুন নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার নূরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। তবে তার শেকড় প্রোথিত ছিল রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। রাজনৈতিক সচেতনতা তিনি পেয়েছিলেন পারিবারিকভাবেই। পিতামহ হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ—উভয় রাজনীতির সাথেই যুক্ত ছিলেন। পিতা আবদুল হামিদ মিয়া দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন রাজশাহী জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে।

​রাজশাহী ও চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৪৪ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে, যেখান থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী আইন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৫৬ সালে রাজশাহী জজকোর্টে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। আইনের ছাত্র ও পেশাজীবী হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও সাংবিধানিক ভিত্তি সম্পর্কে তার ছিল গভীর জানাশোনা।

​ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে

ছাত্রজীবনেই তার রাজনৈতিক প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র লীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক এবং ১৯৪৩-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর খুব দ্রুতই নিজ যোগ্যতায় ১৯৫৭ সালে তিনি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

​আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে, ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার অধীনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির পক্ষে তিনি রাজপথে নেমে আসেন। ১৯৬৭ সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং গণপরিষদে বিরোধী দলীয় উপনেতার দায়িত্ব পান তিনি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির সমর্থনে ১৯৬৯ সালে তিনি সাহসিকতার সাথে নিজের আসন থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবেও তিনি জোরালো ভূমিকা রাখেন।

​মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারে অনবদ্য ভূমিকা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম সামরিক অভিযানের পর অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদকে সাথে নিয়ে বগুড়া সীমান্ত অতিক্রম করে কলকাতায় পৌঁছান এবং তাজউদ্দীন আহমদের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের আলোচনায় যুক্ত হন।

​১০ এপ্রিলে গঠিত এবং ১৭ এপ্রিলে শপথ নেওয়া ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারে কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। যুদ্ধকালীন সেই সংকটময় সময়ে ত্রাণ বিতরণ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করা এবং প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় তার দক্ষতা ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

​সংবিধান প্রণয়ন ও সংসদীয় বিতর্ক

১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গণপরিষদে ড. কামাল হোসেনকে প্রধান করে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিতে ক্রমানুসারে কামারুজ্জামানের স্থান ছিল চার নম্বরে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও খন্দকার মোশতাক আহমদের পরপরই)।

​ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রগঠনের নানামুখী ব্যস্ততার কারণে খসড়া কমিটির নিয়মিত বৈঠকে তাকে হয়তো প্রতিনিয়ত দেখা যায়নি, কিন্তু গণপরিষদে সংবিধান বিলের ওপর যে তীব্র ও বিশদ আলোচনা (১৯-৩০ অক্টোবর ১৯৭২) চলেছিল, সেখানে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নিজের যৌক্তিক বক্তব্য তুলে ধরেন। কমিটির ৬ জন সদস্য খসড়ার ওপর লিখিত ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিলেও, কামারুজ্জামান মূল দলিলের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছিলেন। অবশেষে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর এই সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে তা বলবৎ হয়। খসড়া তৈরির নিয়মিত উপস্থিতির চেয়ে প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ ও আইনসভার আলোচনায় তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।

​যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক সততা

১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর বিজয়ী বেশে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে সরকারে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়, যেখানে তিনি পুনরায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সফলতার সাথে সামলেছেন।

​১৯৭৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে রাজশাহীর দুটি আসন (গোদাগাড়ী ও তানোর) থেকে তিনি জয়লাভ করেন। নির্লোভ এই রাজনীতিক ১৯৭৪ সালে স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নিয়োগ পান এবং বাকশাল-এর কার্যনির্বাহী কমিটিতে স্থান পান।

​কালরাতের ট্র্যাজেডি এবং অজেয় এক নেতার বিদায়

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর গ্রেপ্তার হন কামারুজ্জামান। একই বছরের ৩ নভেম্বর কালরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন কক্ষে ঘাতক সেনা সদস্যরা তাকেসহ জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিনের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তাদের ওপর চালানো এই বর্বরতার ভয়াবহ সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি “জেল হত্যা দিবস” নামে এক কালিমালিপ্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

​ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫১ সালে জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের ছয় সন্তানের মধ্যে অন্যতম এ এইচ এম খাইরুজ্জামান লিটন পরবর্তীতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ৩৩ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কখনোই কোনো নির্বাচনে পরাজিত না হওয়া এই অজেয় ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পথচলার ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট