
আদালত বার্তা | আইন-আদালত
৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধের উদ্যোগ: আইনমন্ত্রী
বর্তমান আইনে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই, আইনগত পরিবর্তন হলে বদলাবে এনরোলমেন্টের কাঠামো
নিজস্ব প্রতিবেদক | আদালত বার্তা
ঢাকা, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
৩৫ বছর বয়স অতিক্রম করার পর নতুন করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আয়োজিত ইন্টার্নদের সমাপনী ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। একই অনুষ্ঠানে তিনি আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা, মক্কেলের প্রতি দায়িত্ব এবং গরিব-অসহায় মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
৩৫ বছর সর্বোচ্চ বয়সসীমা বিষয়টি এখনো সরকারের উদ্যোগ/সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে ৩৫ বছরকে সর্বোচ্চ বয়সসীমা হিসেবে কার্যকর করে কোনো নতুন বিধান ইতোমধ্যে আইনে যুক্ত হয়নি। বরং বর্তমানে কার্যকর বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭ ধারায় আইনজীবী হিসেবে ভর্তির ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্ধারিত, কিন্তু ওই ধারায় সর্বোচ্চ বয়সসীমা উল্লেখ নেই।
বর্তমান আইনে কী আছে
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭(১) ধারায় নাগরিকত্ব, ন্যূনতম ২১ বছর বয়স, আইন বিষয়ে ডিগ্রি, বার কাউন্সিল নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান মূল আইনে ২১ বছর হলো ন্যূনতম বয়স; ৩৫ বছর সর্বোচ্চ বয়স—এমন কোনো বিধান নেই।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে সনদ পেতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বার কাউন্সিলের MCQ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ নেওয়ার বিষয়টিও পেশায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
কেন ৩৫ বছর বয়সসীমার প্রশ্ন উঠল
চলতি বছরের আগস্টে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের কাছে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের আবেদন করে। সমিতির বক্তব্য ছিল, বিভিন্ন পেশায় কর্মজীবন শেষ করে অবসর নেওয়ার পর অনেকে অ্যাডভোকেটশিপ সনদ নিয়ে আইন পেশায় প্রবেশ করছেন। এতে নবীন আইনজীবীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং তাদের পেশাগত সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বারের আবেদনে আরও বলা হয়, সমিতিতে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ আইনজীবী সদস্য রয়েছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বার কাউন্সিল থেকে সনদপ্রাপ্ত প্রায় ১ হাজার ১১১ জন নবীন আইনজীবী সেখানে সদস্য হয়েছেন। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিনশ নতুন আইনজীবী সদস্যপদ নিচ্ছেন বলেও ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ আইনমন্ত্রী যে ৩৫ বছর বয়সসীমার কথা এখন বলছেন, তার আগে থেকেই আইনজীবী মহলের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও দাবি জানিয়ে আসছিল।
সুপ্রিম কোর্টের পুরোনো রায়েও উঠেছিল বয়স সীমার প্রশ্ন
বিষয়টি বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থায় একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালের একটি আপিল বিভাগের রায়ে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।
আপিল বিভাগ তখন উল্লেখ করেন, প্রচলিত আইনে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত থাকলেও সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারিত নেই। এমনকি ৪০ বা ৪৫ বছর বয়সের পর এনরোলমেন্ট বন্ধ করার প্রস্তাবের কথাও রায়ে উঠে আসে। তবে নির্দিষ্ট আইন ছাড়া আদালতের পক্ষে নিজের উদ্যোগে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা যায় কি না—সেটিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
আপিল বিভাগের ওই রায়ে আরও বলা হয়েছিল, আইন পেশা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং আধুনিক সময়ে করপোরেট আইন, মেধাস্বত্ব, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ফরেনসিক প্রমাণসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে দক্ষ আইনজীবীর প্রয়োজন বাড়ছে। একই সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা ও মান বজায় রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু বয়সসীমা নয়, পেশাগত নৈতিকতার বিষয়ও
মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী নবীন আইনজীবীদের গরিব ও অসহায় মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি পেশাগত নৈতিকতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বিচারকদের মতো আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও ভুল, অসদাচরণ ও পেশাগত অনিয়মের জন্য জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন।
তিনি আইনজীবীদের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা এবং মক্কেলকে ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা পরিহারের আহ্বানও জানান। ফলে ৩৫ বছর বয়সসীমার প্রস্তাবটি কেবল নতুন আইনজীবীদের প্রবেশের বয়স নিয়ে নয়; একই সঙ্গে আইন পেশার মান, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত শৃঙ্খলা নিয়েও সরকারের বৃহত্তর চিন্তার অংশ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তবে বড় প্রশ্ন—৩৫ বছর কার্যকর হবে কীভাবে?
এখানেই মূল আইনি প্রশ্নটি সামনে আসছে। বর্তমান আইনে ৩৫ বছর সর্বোচ্চ বয়স নয়। তাই শুধু মন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে এখনই ৩৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের আইনজীবী হওয়ার পথ আইনগতভাবে বন্ধ হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না।
কারণ, বর্তমান আইনের ২৭ ধারায় ২১ বছরকে ন্যূনতম বয়স বলা হয়েছে এবং অন্যান্য যোগ্যতার সঙ্গে বার কাউন্সিল নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, আপিল বিভাগের আলোচনায় বার কাউন্সিলের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা এবং বয়সসীমা নির্ধারণের প্রশ্নও এসেছে। ফলে সরকার যদি ৩৫ বছরকে সর্বোচ্চ বয়স করতে চায়, তাহলে কোন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে তা করা হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কারা প্রভাবিত হতে পারেন?
নীতিটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারেন—
আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিলম্বে বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিতে চাওয়া ব্যক্তিরা;
অন্য পেশায় কর্মজীবন শেষে আইন পেশায় আসতে আগ্রহীরা;
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা আইন graduates;
ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে নির্ধারিত সময়ে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা প্রার্থীরা।
অন্যদিকে, তরুণ আইন graduates-দের জন্য পেশায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং আইনজীবীর সংখ্যা ও কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য রক্ষার যুক্তি সামনে আসতে পারে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিও মূলত নবীনদের কর্মক্ষেত্র তৈরি এবং পেশায় ভারসাম্য আনার যুক্তিতেই ৩৫ বছর বয়সসীমার দাবি জানিয়েছিল।
আদালত বার্তার বিশ্লেষণ
আইন পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের প্রশ্নটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আইন শিক্ষা, পেশাগত স্বাধীনতা, সমান সুযোগ, নবীন আইনজীবীদের কর্মসংস্থান এবং পেশার মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
একদিকে নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। অন্যদিকে বয়সের কারণে একজন আইন বিষয়ে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিকে সম্পূর্ণভাবে পেশায় প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার আগে নীতিটির উদ্দেশ্য, যৌক্তিকতা, ব্যতিক্রম এবং সাংবিধানিক ভিত্তি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আপিল বিভাগের ২০১৭ সালের রায়ে যখন বলা হয়েছিল যে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারিত নেই এবং নির্দিষ্ট আইন ছাড়া বয়সসীমা আরোপের প্রশ্নে জটিলতা রয়েছে, তখন নতুন কোনো সীমা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি ও সুনির্দিষ্ট বিধান প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সর্বশেষ অবস্থা
১৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধের বিষয়টি সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ/পরিকল্পনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে; এটি ইতোমধ্যে কার্যকর আইন হিসেবে চালু হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকারি আইনভান্ডারে বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭ ধারায় এখনো ২১ বছরকে ন্যূনতম বয়স হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই এখনই ৩৫ বছরের বেশি বয়সী কেউ বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না—এমন চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো নির্ধারিত হয়নি