
আদালত বার্তা ডেস্ক
ঢাকা | ৮ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন একটি মামলার মূল নথিতে জালিয়াতি করে আসামির নাম ও ঠিকানা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মামলার বাদী মো. নূরে আলমকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় তার সাবেক আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) ঢাকার ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমানের নির্দেশে আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. শরীফ উদ্দিন ভূঁইয়া রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় এ মামলা করেন। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা পোস্ট, দ্য ডেইলি অবজারভার এবং ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আদালত সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর একটি মামলার শুনানির সময় মামলার নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এ সময় বাদী নূরে আলম নিজের প্রয়োজনে নথিটি দেখার জন্য বেঞ্চ সহকারীর কাছ থেকে নেন।
পরে ওই দিন সন্ধ্যায় আদালতের নথিপত্র গোছানোর সময় বেঞ্চ সহকারী দেখতে পান, মামলার মূল নালিশি দরখাস্তে কাটাকাটি ও পরিবর্তন করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যালোচনায় নথির আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজেও একই ধরনের পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যায়।
মামলার এজাহার ও আদালতের নথির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নালিশি দরখাস্তে টাইপ করা ২ নম্বর আসামি ‘জুনায়েত’-এর নাম ও ঠিকানা কেটে হাতে লিখে ‘সজিব হোসেন ওরফে বাবু’ নাম বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে তার বাবার নাম ও ঠিকানাতেও পরিবর্তন আনার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু মূল নালিশি দরখাস্ত নয়, এর সত্যায়িত অনুলিপি এবং মামলার তদন্ত প্রতিবেদনেও একইভাবে আসামির নাম পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যায়। অথচ নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করা সজিব হোসেন ওরফে বাবুর বিরুদ্ধে আদালত এর আগে কোনো আমল গ্রহণ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে অসঙ্গতির বিষয়টি বিচারকের নজরে আনার পর আদালতের নির্দেশে বাদী নূরে আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর, আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নূরে আলম দাবি করেন, তিনি নিজে নথিতে কোনো পরিবর্তন করেননি। তার অভিযোগ, তার পূর্বে নিয়োজিত আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান খান এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজন ব্যক্তি পরস্পর যোগসাজশে নথিতে আসামির নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন। তবে বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া মামলার মূল নালিশি দরখাস্ত, তার অনুলিপি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পূর্ববর্তী আদেশনামায় কাটাকাটি করে ‘জুনায়েত’-এর স্থলে ‘সজিব হোসেন ওরফে বাবু’র নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ঘটনায় বাদী ও তার পূর্বের আইনজীবী ছাড়াও অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তাই বিষয়টি সরাসরি আমলে না নিয়ে বেঞ্চ সহকারীকে কোতোয়ালি থানায় এজাহার দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত মামলায় বাদী নূরে আলমকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আদালতের নথিপত্রে কাটাকাটি ও জালিয়াতি করে আসামির নাম পরিবর্তনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। আদালতের মূল নথিপত্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপ হলে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, কোনো আইনজীবী বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল কালাম খান বলেন, আইন পেশা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশা। কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতের নথি জালিয়াতি বা কাটাকাটির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে শোকজ করা হতে পারে এবং তদন্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে আইনজীবী সমিতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনা আদালতের মূল নথি সংরক্ষণ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং নথি দেখার অনুমোদিত প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি বিচারাধীন মামলার মূল নথিতে অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের কাটাকাটি, সংযোজন বা পরিবর্তন ঘটলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট মামলার গতিপথকেই প্রভাবিত করতে পারে না, বরং বিচারিক নথির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
এর আগে ২০২৩ সালেও ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রেকর্ডরুম থেকে মামলার মূল নথি সরিয়ে জাল কাগজপত্র প্রতিস্থাপনের অভিযোগে ১০ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছিল। ওই ঘটনায় নথির আরজি, আদেশ, রায় ও ডিক্রি জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসে।
তবে বর্তমান ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে নথিতে আসামির নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।