
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয়ে সম্প্রীতির আলোকবর্তিকা: গুরুদুয়ারা নানকশাহী
স্টাফ রিপোর্টার,আদালত বার্তাঃ ঢাকা, ১১ জুলাই ২০২৬
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—যেখানে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর চারপাশ। এই কোলাহলের মাঝেই রোকেয়া হলের বিপরীতে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে শিখ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উপাসনালয় ‘গুরুদুয়ারা নানকশাহী’। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে এটি দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব জি ১৫০৬-১৫০৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ধর্মপ্রচার যাত্রার অংশ হিসেবে ঢাকায় আগমন করেন। তাঁর এই সফরের স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই ১৮৩০ সালের দিকে মোগল স্থাপত্যশৈলীতে গম্বুজসমৃদ্ধ এই গুরুদুয়ারা নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এর ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়েছে।
স্থাপনাটির স্থাপত্যে মোগল প্রভাব সুস্পষ্ট—সাদামাটা অথচ নান্দনিক নকশা, গম্বুজাকৃতি ছাদ এবং প্রশান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ভেতরের প্রার্থনাকক্ষটি পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল, যেখানে প্রতিদিন নিয়মিত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’ এখানে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষিত থাকে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাঠ করা হয়।
গুরুদুয়ারাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বজনীনতা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেকোনো ব্যক্তি এখানে প্রবেশ করতে পারেন। তবে শিখ ধর্মের রীতিনীতি অনুযায়ী ভেতরে প্রবেশের আগে মাথা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা এবং হাত-পা পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। এটি পবিত্রতা, বিনয় ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
বিশেষ করে শুক্রবারে এখানে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এদিন বৃহৎ পরিসরে ‘শব্দ কীর্তন’ বা সমবেত প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। শিখ ভক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীরাও এতে অংশ নেন, যা সম্প্রীতির এক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে।
প্রার্থনা শেষে শুরু হয় ‘লঙ্গর’—শিখ ধর্মের এক অনন্য সামাজিক ও মানবিক আয়োজন। গুরু নানক দেব জি প্রবর্তিত এই ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো সমতা, ভাগাভাগি ও নিঃস্বার্থ সেবা। লঙ্গরে সবাই মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে বসে (যা ‘পঙ্গত’ নামে পরিচিত) একসাথে খাবার গ্রহণ করেন। এখানে ধনী-দরিদ্র, সামাজিক অবস্থান বা ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো ভেদাভেদ থাকে না।
লঙ্গরের খাবার সম্পূর্ণ নিরামিষ, যাতে থাকে ভাত, ডাল,
সবজি বা সয়াবিনের তরকারি এবং কখনো মিষ্টান্ন হিসেবে পায়েস। এই নিরামিষ খাবার সকল ধর্মের মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হওয়ায় অংশগ্রহণে কোনো বাধা থাকে না। খাবারের সরলতা ও আন্তরিক পরিবেশই এখানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
লঙ্গরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সেবা’ বা স্বেচ্ছাসেবা। রান্না করা, পরিবেশন করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—সব কাজই ভক্ত ও দর্শনার্থীরা স্বেচ্ছায় সম্পন্ন করেন। এই সেবামূলক কার্যক্রম মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
ঢাকার বহুমাত্রিক নগরজীবনে যেখানে বিভাজন ও ব্যস্ততা প্রায়ই প্রাধান্য পায়, সেখানে গুরুদুয়ারা নানকশাহী এক ভিন্ন বার্তা দেয়—শান্তি, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও মানবিক মিলনস্থল, যেখানে মানুষ ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
ছুটির দিনে কিংবা অবসর সময়ে নগর জীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্নধর্মী এক প্রশান্তি, মানবিকতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ অনুভব করতে চাইলে গুরুদুয়ারা নানকশাহী হতে পারে একটি অনন্য গন্তব্য।