
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন এসএনএ চার্জ
ইউনিটপ্রতি আধা পয়সা—১,১৬০ মেগাওয়াটে বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
২৩ আগস্ট ২০২৬
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যয়ের সঙ্গে নতুন একটি খরচ যুক্ত হতে যাচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন, গ্রিড পরিচালনা, শিডিউলিং, মিটারিং, এনার্জি অ্যাকাউন্টিং এবং বিদ্যুৎ লেনদেনের আর্থিক নিষ্পত্তির জন্য ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ (SNA) চার্জ দিতে হবে বাংলাদেশকে।
প্রস্তাবিত হার অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য এ চার্জ হবে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি, অর্থাৎ আধা ভারতীয় পয়সা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি বিদ্যুতের মূল ক্রয়মূল্য বা ট্যারিফের অংশ নয়; মূল বিদ্যুৎমূল্যের বাইরে আলাদাভাবে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। একই ধরনের হার ভারত-নেপাল ও ভারত-ভুটান বিদ্যুৎ বাণিজ্যেও কার্যকর রয়েছে।
চুক্তি হচ্ছে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য
এ বিষয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (NVVN) এবং বাংলাদেশের বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)-এর মধ্যে এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ গত ১৮ আগস্ট অর্থ বিভাগের কাছে এ চুক্তির বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত বিধিবিধানের কারণে এ ধরনের চুক্তি প্রয়োজন। চুক্তি সম্পাদনে বিলম্ব হলে NVVN-এর মাধ্যমে আমদানি করা ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
দরকষাকষিতে অর্ধেক হলো চার্জ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা Central Electricity Regulatory Commission (CERC) আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য প্রথমে প্রতি ইউনিটে ০.০১ ভারতীয় রুপি চার্জের প্রস্তাব দিয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনার পর সেই হার কমিয়ে ০.০০৫ রুপি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক দাবির তুলনায় চার্জ অর্ধেকে নেমেছে।
এক ঘণ্টায় ৫ হাজার ৮০০ রুপি
১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পূর্ণ সক্ষমতায় এক ঘণ্টা আমদানি হলে বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট।
প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি হারে হিসাব করলে এক ঘণ্টায় SNA চার্জ দাঁড়ায়—
১১,৬০,০০০ × ০.০০৫ = ৫,৮০০ ভারতীয় রুপি।
অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৫,৮০০ রুপি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে একই হিসাব পাওয়া গেছে।
বছরে কত হতে পারে?
এখানেই ছোট একটি চার্জের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
যদি ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পুরো সক্ষমতায় ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা আমদানি করা হয়, তাহলে বছরে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ হবে প্রায় ১,০১৬ কোটি ১৬ লাখ ইউনিট।
প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি হিসাবে বছরে SNA চার্জ দাঁড়াবে প্রায়—
৫ কোটি ৮ লাখ ভারতীয় রুপি।
আগস্টের সাম্প্রতিক বিনিময় হার আনুমানিক ১ ভারতীয় রুপি = ১.২৭৬ বাংলাদেশি টাকা ধরলে এর পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ বাংলাদেশি টাকা। বিনিময় হার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃত টাকার অঙ্কও পরিবর্তিত হবে।
তবে এটি একটি তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ হিসাব। বাস্তবে বিদ্যুৎ আমদানি সবসময় পূর্ণ ১,১৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতায় ২৪ ঘণ্টা চলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে প্রকৃত বার্ষিক SNA ব্যয় এর চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে, আমদানির পরিমাণ ও নিষ্পত্তিযোগ্য ইউনিটের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের মোট ভারতীয় বিদ্যুৎ নির্ভরতা কত?
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানি সক্ষমতা ২,৬৫৬ মেগাওয়াট।
এর মধ্যে রয়েছে—
NVVN-এর মাধ্যমে NTPC থেকে ২৫০ মেগাওয়াট;
Damodar Valley Corporation (DVC) থেকে ৩০০ মেগাওয়াট;
Tripura State Electricity Corporation থেকে ১৬০ মেগাওয়াট;
PTC India-এর মাধ্যমে Sembcorp Energy India থেকে ২০০ মেগাওয়াট;
Sembcorp Energy India থেকে সরাসরি ২৫০ মেগাওয়াট।
সব মিলিয়ে এসব উৎসের পরিমাণ ১,১৬০ মেগাওয়াট—যার জন্যই নতুন SNA চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মধ্যেই এ ধরনের চার্জের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় ওই বিদ্যুতের জন্য আলাদা SNA চুক্তির প্রয়োজন হবে না।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব কী বলছে?
বিদ্যুৎ আমদানির ওপর বাংলাদেশের আর্থিক নির্ভরতার মাত্রা বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আদানি পাওয়ার, NVVN, PTC India ও Sembcorp—এই উৎসগুলো থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১,৬৪১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে এবং এর মূল বিদ্যুৎমূল্য বাবদ পরিশোধ করেছে প্রায় ১৬,৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ভারতীয় বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় শুধু একটি অতিরিক্ত উৎস নয়; আমদানি ব্যয়ের দিক থেকেও এটি একটি বড় আর্থিক খাত।
SNA চার্জ আসলে কী?
SNA চার্জকে সরাসরি ‘বিদ্যুতের নতুন দাম’ বলা ঠিক হবে না। এটি মূলত আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের প্রশাসনিক ও কারিগরি অবকাঠামো পরিচালনার খরচ।
এর মধ্যে রয়েছে—
শিডিউলিং: কোন সময়ে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে তার সমন্বয়।
মিটারিং: সীমান্তবর্তী আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়েছে তার পরিমাপ।
এনার্জি অ্যাকাউন্টিং: সরবরাহ, গ্রহণ ও ব্যবহারের পরিমাণের হিসাব মিলিয়ে দেখা।
গ্রিড ব্যবস্থাপনা: আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ প্রবাহকে সংশ্লিষ্ট গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করা।
সেটেলমেন্ট: বিদ্যুৎ লেনদেন, গ্রিড চার্জ, নির্ধারিত সরবরাহের তুলনায় কম-বেশি সরবরাহজনিত ডেভিয়েশন চার্জসহ সংশ্লিষ্ট আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি করা।
ভারতের CERC-এর ব্যবস্থার অধীনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে এ ধরনের নিষ্পত্তি কাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে। নেপাল ও ভুটানের ক্ষেত্রেও একই ০.০০৫ রুপি হারের SNA চার্জের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—ছোট চার্জ, কিন্তু বড় নির্ভরতা
প্রতি ইউনিটে আধা পয়সা শুনতে খুবই সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় সামান্য ইউনিটপ্রতি চার্জও সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য অর্থে পরিণত হয়।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি, গ্যাস সংকট, দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
ফলে বিদ্যুৎ আমদানির মূল ট্যারিফের পাশাপাশি হুইলিং/সঞ্চালন, গ্রিড-সংক্রান্ত ব্যয় এবং এখন SNA চার্জ—সবগুলো খরচকে সমন্বিতভাবে হিসাব করা জরুরি।
শুধু চার্জ নয়, দরকার স্বচ্ছ ব্যয় বিশ্লেষণ
বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে SNA চার্জ আরোপের যৌক্তিকতা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গ্রিড পরিচালনা ও আর্থিক নিষ্পত্তির বাস্তব খরচ থাকে। নেপাল ও ভুটানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চার্জ থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই চার্জের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানির মোট ব্যয় কতটা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর আর্থিক দায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে তাই শুধু ‘প্রতি ইউনিটে আধা পয়সা’ হিসাব না করে বিদ্যুতের মূল দাম + সঞ্চালন/হুইলিং ব্যয় + SNA চার্জ + অন্যান্য সংশ্লিষ্ট চার্জ + বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় ঝুঁকি—সব মিলিয়ে প্রতি ইউনিট আমদানির প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বনাম আমদানি নির্ভরতা
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভারতের সরকারি তথ্যেও বাংলাদেশে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং দুই দেশের বিদ্যুৎ সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সহযোগিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে আমদানি নির্ভরতা যত বাড়বে, ততই আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ বাজারের মূল্য, বিনিময় হার, সঞ্চালন ব্যয় এবং আন্তঃসীমান্ত চার্জ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
সুতরাং SNA চার্জকে বিচ্ছিন্ন একটি নতুন মাশুল হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রস্তাবিত SNA চার্জের হার খুব বড় নয়—এটি বাস্তবতা। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ব্যাপ্তি বিবেচনায় এর আর্থিক প্রভাবকে একেবারে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
বিশেষ করে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পূর্ণ সক্ষমতায় আমদানি হলে শুধু এই চার্জ বাবদ বছরে আনুমানিক ৫ কোটি ভারতীয় রুপি, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে—যদিও বাস্তব আমদানি কম-বেশি হওয়ায় প্রকৃত অঙ্কও পরিবর্তিত হবে।
এ কারণে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তিনটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন—চার্জের আইনগত ভিত্তি, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় এবং বিদ্যুৎ আমদানির প্রকৃত মোট ইউনিট ব্যয়।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই বাণিজ্য যেন কেবল বিদ্যুৎ পাওয়ার হিসাবেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত আর্থিক মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ দায়ও একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়—এটাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।