শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন
Title :
গানভরের সঙ্গে এলএনজি চুক্তি: শুরুতে চড়া দাম, দীর্ঘমেয়াদে সস্তার আশ্বাস স্মার্টফোন, AI ও আইনজীবীর নতুন Drafting Assistant Junior Lawyer-এর Drafting দক্ষতায় আসছে নতুন পরিবর্তন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন, মধ্যরাতে প্রজ্ঞাপন মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েশন: প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও বাস্তব কাজের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ। বিশেষ প্রতিবেদন নিট এফডিআই ৩৯.৩৬% বাড়লেও নতুন বিনিয়োগে ভাটা পরিসংখ্যানের আড়ালে কি আস্থার সংকট? স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবেদন চাইলেন সিইসি সীমান্ত নিরাপত্তায় সক্ষমতা বাড়াচ্ছে সরকার চিকেনস নেকে’ চতুর্থ রেললাইনের অনুমোদন ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দল বিদ্যমান সংবিধান স্বীকৃতি দিয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি পদে প্রত্যাশার আলো জাতীয় অভিভাবকত্ব ও সাংবিধানিক মর্যাদার নতুন দিগন্ত

গানভরের সঙ্গে এলএনজি চুক্তি: শুরুতে চড়া দাম, দীর্ঘমেয়াদে সস্তার আশ্বাস

  • প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

গানভরের সঙ্গে এলএনজি চুক্তি: শুরুতে চড়া দাম, দীর্ঘমেয়াদে সস্তার আশ্বাস
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা | ২২ আগস্ট ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের পুরোনো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে এখন তুলনামূলক বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি-র সঙ্গে ১৩ বছরের একটি চুক্তি করেছে।
চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি বাংলাদেশে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রথম পর্যায়ে এশিয়ার স্পট বাজারের জাপান-কোরিয়া মার্কার (JKM) এবং পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে চুক্তিটির আর্থিক সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি আশাবাদও রয়েছে।
প্রথম তিন বছরে ব্যয়ের চাপ
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করা হবে। এসব কার্গোর মূল্য নির্ধারণ হবে JKM + প্রতি এমএমবিটিইউতে ০.০৮৭৫ ডলার ফর্মুলায়।
১৬ আগস্টের JKM দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.২১ ডলার ধরে হিসাব করলে গানভরের এলএনজির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২১.৩০ ডলার।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় এই মূল্য বাংলাদেশের বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি তেল-সূচকভিত্তিক এলএনজি চুক্তিগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই দিনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৮.৫২ ডলার। ওই দরের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি তেল-নির্ভর চুক্তির এলএনজি মূল্য আনুমানিক ১০.৯৩ থেকে ১২.৩২ ডলারের মধ্যে পড়ে।
অর্থাৎ বর্তমান বাজারদরে প্রথম তিন বছরে গানভরের জেকেএম-ভিত্তিক এলএনজি বাংলাদেশের প্রচলিত কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় প্রতি এমএমবিটিইউতে প্রায় ৯ থেকে ১০ ডলার পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে গানভরের সুবিধা
তবে একই JKM সূচকে পরিচালিত বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে গানভরের অবস্থান কিছুটা সুবিধাজনক।
২০২৫-২৬ সালের জন্য ওকিউ ট্রেডিংয়ের চুক্তিতে JKM-এর সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ০.১৫ ডলার প্রিমিয়াম রয়েছে। আরামকো ট্রেডিংয়ের চুক্তিতে প্রিমিয়াম ০.১৪৫ ডলার এবং সোকার ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে ০.১২৫ ডলার।
এর বিপরীতে গানভরের প্রিমিয়াম মাত্র ০.০৮৭৫ ডলার। অর্থাৎ একই JKM বাজারদরে গানভরের প্রিমিয়াম বিদ্যমান কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির চেয়ে কম।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—গানভরের এই সুবিধা এসেছে মূলত কম প্রিমিয়ামের কারণে। JKM সূচক নিজে কম থাকার কারণে নয়। ফলে এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারে দাম বেড়ে গেলে গানভরের সরবরাহের দামও একই সঙ্গে বেড়ে যাবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে হেনরি হাব: কম দামের সম্ভাবনা
চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ২০২৯ সাল থেকে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন।
২০২৮ সালে তিনটি কার্গোর পর ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০টি করে কার্গো সরবরাহ করা হবে। এসব কার্গোর মূল্য নির্ধারণ হবে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ৫.২০ ডলার যোগ করে।
১৭ আগস্ট হেনরি হাবের দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২.৭১ ডলার ধরে হিসাব করলে গানভরের ফর্মুলায় এলএনজির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮.৪৮ ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৯ সাল থেকে হেনরি হাবের গড় মূল্য যদি প্রতি এমএমবিটিইউ ৩.৪০ থেকে ৪.৩০ ডলারের মধ্যে থাকে, তাহলে গানভরের ফর্মুলায় বাংলাদেশের এলএনজির সম্ভাব্য মূল্য হতে পারে প্রায় ৯.৩১ থেকে ১০.৪০ ডলার।
এই মূল্য বর্তমান JKM-নির্ভর দামের তুলনায় অনেক কম এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি তেল-ভিত্তিক চুক্তির দামের কাছাকাছি।
তবে হেনরি হাবের শর্ত নিয়েও প্রশ্ন
দীর্ঘমেয়াদে কম দামের সম্ভাবনা থাকলেও গানভরের হেনরি হাব ফর্মুলার শর্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন এলএনজি চুক্তির সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। কাতারএনার্জি ট্রেডিংয়ের সঙ্গে ভারতের জিএআইএলের চুক্তিতে হেনরি হাবের ১১৫ শতাংশ + ৫.৬৬ ডলার ফর্মুলা রয়েছে। একই বাজারদরে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮.৭৮ ডলার।
অন্যদিকে ট্রাফিগুরার সঙ্গে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের চুক্তিতে রয়েছে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশ + ৪.৫০ ডলার ফর্মুলা। একই বাজারদরে এর মূল্য প্রায় ৭.৭৮ ডলার।
চীনের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও প্রায় একই ধরনের ১২১ শতাংশ + ৪.৫০ ডলারের ফর্মুলা ব্যবহৃত হয়েছে।
সেই তুলনায় গানভরের ১২১ শতাংশ + ৫.২০ ডলার কাঠামোতে অতিরিক্ত ০.৭০ ডলারের প্রিমিয়াম রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে হেনরি হাবের দাম কমে গেলেও চুক্তির এই অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাংলাদেশের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চুক্তির আসল প্রশ্ন—বর্তমান ব্যয় নাকি দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়?
গানভরের চুক্তিকে এককভাবে ‘ব্যয়বহুল’ বা ‘সাশ্রয়ী’ হিসেবে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ চুক্তিটির দুই পর্যায়ে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে JKM-ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের কারণে ২০২৬-২০২৮ সালে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের এশীয় স্পট বাজারের ঝুঁকি বহন করতে হবে। বিপরীতে ২০২৯ সাল থেকে হেনরি হাব-ভিত্তিক মূল্য চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম দামের গ্যাস বাজারের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে চুক্তির প্রকৃত আর্থিক ফল নির্ভর করবে আগামী এক দশকে JKM, ব্রেন্ট ক্রুড এবং হেনরি হাব—এই তিনটি আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের গতিপ্রকৃতির ওপর।
যুদ্ধ-পরবর্তী বাজারে ঝুঁকি কতটা?
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বড় একটি ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথম তিন বছরে JKM-ভিত্তিক গানভরের কার্গো বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে।
অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হলে এবং বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ বাড়লে JKM-এর দাম কমতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়লে হেনরি হাব-ভিত্তিক চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ চুক্তিটির ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে মূল্যসাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা গড় মূল্যে
জ্বালানি বিভাগের মূল্য সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণের মূল যুক্তি হলো—চুক্তির প্রথম কয়েক বছরে JKM-ভিত্তিক তুলনামূলক বেশি দামের এলএনজি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে হেনরি হাব-ভিত্তিক তুলনামূলক কম দামের এলএনজি একসঙ্গে বিবেচনা করলে পুরো ১৩ বছরের গড় ক্রয়মূল্য বাংলাদেশের বিদ্যমান কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় কম হতে পারে।
তবে সেই হিসাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ওপর। বিশেষ করে ব্রেন্টের দাম কমে গেলে তেল-ভিত্তিক পুরোনো চুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে আরও সস্তা হয়ে উঠতে পারে। আবার JKM দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে গানভরের প্রথম পর্যায়ের সরবরাহ বাংলাদেশের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় চুক্তির গুরুত্ব
সবশেষে, চুক্তিটির মূল্য শুধু প্রতি এমএমবিটিইউতে কত ডলার—এ দিয়ে বিচার করলে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট এবং স্পট মার্কেটের মূল্য অস্থিরতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
দীর্ঘমেয়াদি ১১৭ কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে অন্তত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এলএনজি আমদানির নিশ্চয়তা তৈরি হবে। তবে সেই নিশ্চয়তার সঙ্গে মূল্যঝুঁকিও চুক্তির কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তাই গানভর চুক্তির সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে নয়; বরং আগামী ১৩ বছরে বাংলাদেশ কত দামে এলএনজি কিনছে, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের সঙ্গে সেই মূল্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিপরীতে আর্থিক ব্যয়ের ভারসাম্য কতটা বজায় রাখা যাচ্ছে—তার ওপর।
সার্বিকভাবে বলা যায়, গানভরের চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে একটি স্বল্পমেয়াদি মূল্যঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য সাশ্রয়ের সমীকরণ। প্রথম তিন বছরে উচ্চমূল্যের চাপ থাকলেও পরবর্তী দশকে হেনরি হাব-ভিত্তিক সরবরাহের মাধ্যমে সেই বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপথ সরকারের প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে এই চুক্তিই ভবিষ্যতে বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট