
আদালত বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
শৃঙ্খল ভেঙে সাফল্যের শিখরে ব্যারিস্টার আঞ্জুমান আরা লিমার হার না মানা জীবনযুদ্ধ
আদালত বার্তা ডেস্ক:২ নভেম্বর ২০২৬
কালো কোট, গাউন আর এজলাসে আইনের ধারালো যুক্তিতর্ক—বাইরে থেকে একজন সফল আইনজীবীর এই গাম্ভীর্যপূর্ণ অবয়বটুকু দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই দৃশ্যমান সাফল্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে কত শত বিনিদ্র রজনী, নিঃশব্দ অশ্রুপাত আর আত্মমর্যাদা রক্ষার রক্তক্ষয়ী লড়াই, তা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। সম্প্রতি আরজে কিবরিয়ার জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘সর্বজয়া’র ১১৮তম পর্বে
তেমনই এক অপ্রিয় অথচ অনুপ্রেরণাদায়ী বাস্তবতার পর্দা উন্মোচন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আঞ্জুমান আরা লিমা। বৈবাহিক জীবনের চরম শারীরিক-মানসিক নিপীড়নকে উপেক্ষা করে কেবল মেধা ও আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে কীভাবে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানো যায়, তিনি আজ তার এক জীবন্ত দলিল।
সোনার খাঁচায় নির্মম বন্দিদশা
কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় অল্প বয়সে ভালোবেসে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। বিত্তবৈভবে পূর্ণ সেই বনেদি শ্বশুরবাড়ির বাহ্যিক চাকচিক্য সমাজে ঈর্ষণীয় হলেও অন্তঃপুরের চিত্র ছিল ভয়াবহ। বিয়ের পর থেকেই কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর ব্যক্তি ও নাগরিক স্বাধীনতা। অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তাঁকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা ছিল পরিবারের পক্ষ থেকে এই সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা প্রদান। ‘দুধ দেওয়া গরু লাথি দিলে সমস্যা নেই’—এমন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় তাঁকে বোঝানো হতো, স্বামী অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও আভিজাত্য দিচ্ছেন বলেই তাঁর যাবতীয় মারধর ও গালিগালাজ সহ্য করে নেওয়াটাই নিয়ম।
‘জাতে মাতাল, তালে ঠিক’: পড়াশোনাই ছিল আত্মরক্ষার ঢাল
অসহ্য নির্যাতন ও অপমানের মাঝেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন এক ব্যতিক্রমী লড়াই। নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এক মুহূর্তের জন্যও। পডকাস্টে তিনি নিজের দর্শন তুলে ধরে অকপটে জানান, শত ঝড়ের মধ্যেও তিনি ‘জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক’ ছিলেন। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত জীবন নরকতুল্য হয়ে উঠলেও ক্যারিয়ার ও পড়ার টেবিলকে তিনি নিজের আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের হাতিয়ার বানিয়ে নেন।
দিনের বেলা অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সয়ে গভীর রাতে যখন বাড়ি নিস্তব্ধ হতো, তখন তিনি বই নিয়ে বসতেন। এই জেদ ও সাধনার ফলেই তিনি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে এলএল.বি (অনার্স) ও এলএল.এম-এ কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো বিলাসিতাই স্থায়ী হতে পারে না। ফলে লোকলজ্জা আর কথিত সামাজিক নিরাপত্তার পিছুটান ছিন্ন করে এক কাপড়ে সেই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত (ডিভোর্স) নেন। তবে তাঁর বক্তব্যে কোনো অন্ধ আক্রোশ ছিল না; বরং জীবনের সেই চরম বৈরী অধ্যায়ের মধ্যেও প্রাক্তনের কিছু মানবিক দিককে তিনি অত্যন্ত পরিণত দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বীকার করেছেন।
লিংকনস ইন থেকে অ্যাটর্নি সার্ভিস: মেধার জয়যাত্রা
ডিভোর্সের পর পরিবার ও নিজের অদম্য সংকল্পে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিশ্বখ্যাত অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে সম্পন্ন করেন বার-অ্যাট-ল। দেশে ফিরে আইন পেশার সূচনা করেন চট্টগ্রাম জজ কোর্টে শিক্ষানবিশ ও আইনজীবী হিসেবে। এরপর মেধার শক্তিতে জায়গা করে নেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে। পরবর্তীতে মেধা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দায়িত্ব পালন করেন রাষ্ট্রের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (AAG) হিসেবেও।
আমাদের সমাজে এখনও প্রচলিত ধারণা রয়েছে—পাবলিক বা নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আইন অঙ্গনে শীর্ষস্থান পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু একটি সাধারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে এসেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হওয়া এবং করপোরেট অঙ্গন শাসন করা যায়, ব্যারিস্টার লিমা তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
আধুনিক লিগ্যাল-টেক উদ্ভাবক ও করপোরেট আস্থা
চিরাচরিত চেম্বার প্র্যাকটিসের বাইরে তিনি বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আইনি সেবার (Legal-Tech) ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। তিনি আইনি সেবাদাতা প্ল্যাটফর্ম ‘লিগ্যালকো লিমিটেড’ (LegalCo Limited)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল রূপান্তরে কাজ করছে।
একই সঙ্গে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিটিআরসি এবং চ্যানেল আই-সহ দেশের ১৮টিরও বেশি শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ৬৮টির বেশি করপোরেট হাউজের প্যানেল আইনজীবী ও লিগ্যাল অ্যাডভাইজার। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (BNWLA) এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সেবামূলক সংস্থা ‘একমাত্র’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নিয়মিত আইনি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যম ও আইনি সাক্ষরতা প্রসার
আদালতের চৌকাঠ পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে আইনকে সহজবোধ্য করতে তিনি বেছে নিয়েছেন গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। রেডিও ধ্বনির ‘আইন ও আদালত’ এবং বাংলাভিশনের ‘প্রসঙ্গ আইন’সহ বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে তিনি নিয়মিত অতিথি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের কাছে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের খুঁটিনাটি সাবলীলভাবে তুলে ধরে নারীদের আইনি অধিকার সচেতন করে তুলছেন তিনি।
|
ব্যারিস্টার আঞ্জুমান আরা লিমা: এক নজরে ক্যারিয়ার মাইলফলক |
তথ্যসূত্র / বিবরণ |
|---|---|
|
আইনি ডিগ্রি |
LL.B (Hons), LL.M (সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি) ও বার-অ্যাট-ল (লিংকনস ইন, যুক্তরাজ্য) |
|
আদালত প্র্যাকটিস |
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ (প্রাক্তন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) |
|
প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব |
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, লিগ্যালকো লিমিটেড (LegalCo Limited) |
|
করপোরেট সেবা |
১৮+ শীর্ষ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ৬৮+ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যানেল আইনজীবী |
|
সামাজিক দায়বদ্ধতা |
সদস্য, BNWLA এবং পরামর্শক, অলাভজনক সংস্থা ‘একমাত্র’ |
একসময় শ্বশুরবাড়ির যে প্রাচুর্যের দেমাগ দেখিয়ে তাঁকে শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তিনি আজ সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী এবং সফল এক উদ্যোক্তা। যে মা-বাবা তাঁর অন্ধকার সময়ে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তিনি স্ব-উপার্জিত সামর্থ্যে সেই মা-বাবা ও সন্তানদের নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হন।
ব্যারিস্টার আঞ্জুমান আরা লিমার জীবনগাথা বিচারপ্রার্থী ও সমাজের প্রতিটি নারীর জন্য এক স্পষ্ট বার্তা দেয়—একটি ভুল বৈবাহিক সম্পর্ক কিংবা চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনোই জীবনের শেষ নয়। সামাজিক লোকলজ্জার চেয়ে আত্মমর্যাদা অনেক বড়; আর একজন নারীর জীবনে সবচেয়ে বড় ও স্থায়ী নিরাপত্তা হলো তাঁর নিজস্ব শিক্ষা, মেধা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা।