
হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল—প্রশ্ন বিএনপির
নিউজ ডেস্ক | আদালত বার্তা: ০৭ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের মৌলিক প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে—এটি তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেখানে অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তাকে সেই সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।”
নয়াদিল্লির সম্মেলন ও বিতর্ক
গত ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে ‘সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এবং দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
একই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, জুলাই আন্দোলনের সহিংসতা প্রসঙ্গে এক পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়া হলে অন্য পক্ষের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তবে আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে যান শেখ হাসিনা—যা নিয়ে দেশে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
বিএনপির ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, “জুলাই আন্দোলনে গণহত্যা চালানো হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা বিদেশে অবস্থান করে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে।”
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে বিচার হবে।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নির্বাহী সিদ্ধান্তে নয়—আইনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে।”
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও আইনি প্রেক্ষাপট
দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী পাস করে, যার ফলে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।
বর্তমানে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলন ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পরই বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে উদ্বেগ জানায়।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দিতে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন। একইসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের সভাপতিকে ঘিরে এ ধরনের আয়োজন দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রচার সীমাবদ্ধতা ও আইনি সতর্কতা
এদিকে, আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার বক্তব্য দেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করার অনুরোধ জানায়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারতের অবস্থান
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সরকারের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পাশাপাশি সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সমর্থন করে না বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র মনে করছে, ভারতের নীরব সম্মতি ছাড়া নয়াদিল্লিতে এ ধরনের আয়োজন সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার বিদেশে অবস্থান করে সক্রিয় বক্তব্য প্রদান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একইসঙ্গে এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও সূক্ষ্ম চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ইস্যু সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী শক্তিগুলোর অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।