
সাংবাদিকের নিবন্ধন: স্বাধীনতা নাকি নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো?
সম্পাদকীয় | আদালত বার্তাঃ২৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ—যেখানে সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং অনৈতিক বা মিথ্যা সংবাদের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে—তা একদিকে যেমন পেশাগত মানোন্নয়নের দাবি তুলছে, অন্যদিকে স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কাও জাগাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংবাদিকতার জন্য রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স বা বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নেই। যুক্তরাজ্য, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন বা অস্ট্রেলিয়ায় সাংবাদিকতা একটি উন্মুক্ত পেশা, যেখানে যোগ্যতা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠান, পাঠক এবং পেশাগত মানদণ্ড—রাষ্ট্র নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির জেনারেল কমেন্ট নং ৩৪ (২০১১) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, সাংবাদিকতা কেবল পেশাদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্লগার ও নাগরিক সাংবাদিকতাও এর অংশ। একইভাবে ARTICLE 19, UNESCO, Reporters Without Borders-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাধ্যতামূলক সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ হিসেবে চীনের প্রেসকার্ড ব্যবস্থা প্রায়ই সমালোচিত হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার অনুমোদন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ধরনের কাঠামো সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনতার পরিবর্তে আনুগত্যের দিকে ঠেলে দেয়—যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সাংবাদিকতার নামে অনিয়ম, ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান, নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল এবং পরিচয়পত্রনির্ভর চাঁদাবাজির মতো সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। তথ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে তিন হাজারের বেশি নিবন্ধিত পত্রিকা এবং হাজারো অনলাইন মাধ্যম রয়েছে, যাদের অনেকেরই কার্যত কোনো পেশাগত কাঠামো নেই। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি জনগণের আস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক নিবন্ধন ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে প্রশ্ন হলো—এই নিবন্ধন কার হাতে এবং কীভাবে পরিচালিত হবে? এখানেই মূল সংকট।
যদি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে তা সহজেই রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হতে পারে। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক যদি ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে নিবন্ধন হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। এতে আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আত্ম-সেন্সরশিপ প্রতিষ্ঠিত হবে—যা গণতন্ত্রের জন্য গভীর হুমকি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক চুক্তি ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদও এই অধিকারকে মৌলিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে সাংবাদিক নিবন্ধনের যে কোনো কাঠামোকে অবশ্যই এই সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হতে পারে—একটি স্বাধীন, স্বশাসিত ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত কমিশনের মাধ্যমে সাংবাদিক নিবন্ধন পরিচালনা করা। এই কমিশনে সাংবাদিক, সম্পাদক, আইনজ্ঞ, গণমাধ্যম গবেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি থাকতে হবে। নিবন্ধন প্রদান, স্থগিত বা বাতিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত শুনানি এবং বিচার বিভাগে আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাংবাদিকতার মান নির্ধারণে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড করা যাবে না। বাস্তবতা হলো, অনেক দক্ষ ও খ্যাতিমান সাংবাদিকের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, কিন্তু তাঁদের কাজই তাঁদের যোগ্যতার প্রমাণ। তাই পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা, অনুসন্ধানী ক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাংবাদিক নির্ধারণ করা নয়; বরং একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকতা, ভুয়া সংবাদমাধ্যম এবং পরিচয়পত্র বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য হওয়া উচিত পেশার মানোন্নয়ন, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা—কখনোই নিয়ন্ত্রণ নয়। কারণ, সত্য বলার সাহস কোনো রাষ্ট্র প্রদান করতে পারে না; সেই সাহস আসে স্বাধীনতা থেকে। আর সেই স্বাধীনতাই গণতন্ত্রের প্রাণ এবং সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি।