সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
Title :
কারাগারে বন্দি মায়ের সঙ্গে ৩০৩ শিশু: হাইকোর্টে প্রতিবেদন ​শিশুদের নিকটাত্মীয় বা সরকারি শিশু পরিবারে রাখার সুপারিশ প্রমাণ ছাড়া শুধু পলাতক থাকলেই সাজা নয়: হাইকোর্ট সন্ত্রাসবিরোধী ও সাইবার আইনের মামলায় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে সত্যতা মেলেনি: স্পিকার আইনজীবীদের আটক নিয়ে উত্তাল সুপ্রিম কোর্ট চত্বর, প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে মিলল মুক্তি অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার সংকোচন: রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর সংকট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দুটি ককটেল নিক্ষেপ, জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ মানবপাচার দমনে অগ্রগতির স্বীকৃতি, তবু টিয়ার-২ তালিকায় বাংলাদেশ জান্নাতুল তাজমীনের মৃত্যু কি আমাদের বিবেককে জাগাবে? ১৩ সেনা হত্যা: সাবেক মার্কিন মেজর নিদালের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে, করা হবে সরাসরি সম্প্রচার

প্রমাণ ছাড়া শুধু পলাতক থাকলেই সাজা নয়: হাইকোর্ট

  • প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

প্রমাণ ছাড়া শুধু পলাতক থাকলেই সাজা নয়: হাইকোর্ট
আদালত বার্তা ডেস্ক
ঢাকা | ১২ অক্টোবর ২০২৬
অকাট্য ও সন্দেহাতীত প্রমাণ ছাড়া কোনো আসামি শুধু পলাতক ছিলেন—এই কারণেই তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া যায় না বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তিও পুলিশি হয়রানি এড়াতে আত্মগোপনে থাকতে পারেন। ফলে আসামির পলাতক থাকা নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগে নিম্ন আদালতে দণ্ডিত ছাতক উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সাবেক রেকর্ড কিপার নীল বরণ ত্রিপুরাকে খালাস দিয়ে দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণ করেন।
বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলাটির আপিল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের তথ্য প্রকাশিত হয়।
গুরুতর সন্দেহও প্রমাণের বিকল্প নয়
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, দাপ্তরিক নথিতে অনিয়ম, ভুয়া নোটিশ কিংবা অন্যান্য অসঙ্গতি আসামির বিরুদ্ধে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় ‘সন্দেহ’ এবং ‘সন্দেহাতীত প্রমাণ’ এক বিষয় নয়।
আদালতের দৃষ্টিতে, কোনো অভিযোগ যতই গুরুতর হোক না কেন, রাষ্ট্রপক্ষকে তা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গুরুতর সন্দেহ কখনোই সন্দেহাতীত প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
যে অভিযোগে মামলা
মামলার নথি অনুযায়ী, নীল বরণ ত্রিপুরা ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে রেকর্ড কিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাকে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে বদলি করা হয়।
দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তা ও সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া আপিল নম্বর, নোটিশ ও রসিদ ইস্যু এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল ছাতক থানায় মামলা করে। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে যায়।
নিম্ন আদালতে তিন বছরের কারাদণ্ড
মামলার বিচার শেষে সিলেটের বিশেষ জজ আদালত ২০২২ সালের ৩০ মার্চ নীল বরণ ত্রিপুরাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি। আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে খালাস দেন।
ঘুষের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি
আপিলের রায় পর্যালোচনায় হাইকোর্ট দেখতে পান, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা আসামির বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করলেও আদালতে সেই লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময়, স্থান কিংবা অর্থের সঠিক পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
এ ছাড়া এজাহারে উল্লিখিত অভিযোগের সঙ্গে আদালতে দেওয়া মৌখিক সাক্ষ্যের মধ্যেও অসঙ্গতি রয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
মূল সাক্ষীর পরিবর্তে তদন্ত কর্মকর্তার ‘শোনা কথা’ গ্রহণযোগ্য নয়
মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযোগ-সংক্রান্ত মূল সাক্ষীকে আদালতে পরীক্ষা করা হয়নি।
আদালত বলেন, মূল সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ না করে তার বক্তব্য সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পাওয়া শোনা কথা বা পরোক্ষ বক্তব্যকে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
অর্থাৎ, কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষ জ্ঞান যার রয়েছে, তাকে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তার বক্তব্য অন্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে তা দিয়ে আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় না।
ফৌজদারি বিচারে প্রমাণের মানদণ্ড নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা
হাইকোর্টের এই রায় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক নীতিকে আবারও সামনে এনেছে—অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি হোক, দণ্ড দেওয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অপরিহার্য।
শুধু আসামির পলাতক থাকা, নথিতে অনিয়ম পাওয়া কিংবা তার বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হওয়া—এসব বিষয় একত্রে থাকলেও সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হয়ে যায় না।
ফৌজদারি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব হলো আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আইনসম্মত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই মানদণ্ড পূরণ না হলে সন্দেহের সুবিধা আসামি পাবেন—এটাই ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি।
আদালত বার্তা বিশ্লেষণ:
এই রায় কেবল একজন আসামির খালাসের বিষয় নয়; বরং ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণের গুণগত মান, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, hearsay বা শোনা কথার সীমাবদ্ধতা এবং ‘সন্দেহ’ বনাম ‘সন্দেহাতীত প্রমাণ’—এই চারটি মৌলিক প্রশ্নের গুরুত্বও সামনে এনেছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের পরিবর্তে প্রমাণই যে দণ্ডের ভিত্তি—রায়ের পর্যবেক্ষণে সেই নীতিই পুনরায় প্রতিফলিত হয়েছে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট