
আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত বিচারপতি হাবিবুল গনির শপথ
দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতার নতুন অধ্যায়
বিশেষ প্রতিবেদন | আদালত বার্তা।৩০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি। রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলেন দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালন করা এই বিচারপতি।
শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছিল, ৩০ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি নবনিযুক্ত বিচারপতিকে শপথ পাঠ করাবেন।
সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে নিয়োগ
বিচারপতি হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় গত ২৭ আগস্ট। আইন ও বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁর নিয়োগ শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।
সংবিধানের এই বিধানের অধীন নিয়োগের ফলে বিচারপতি হাবিবুল গনির বিচারিক দায়িত্বের পরিধি এখন হাইকোর্ট বিভাগ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আপিল বিচারিক ফোরামে বিস্তৃত হলো।
৩৪ বছরের বেশি সময়ের আইন ও বিচারিক পথ
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনির বিচারিক জীবনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আইন পেশা ও হাইকোর্টে এক দশকেরও বেশি সময়ের বিচারিক অভিজ্ঞতা।
১৯৬২ সালের ৩১ মে জন্মগ্রহণকারী বিচারপতি হাবিবুল গনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব সোশ্যাল সায়েন্স (এমএসএস) এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
দীর্ঘ আইন পেশার অভিজ্ঞতার পর ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ফলে হাইকোর্ট বিভাগে তাঁর বিচারিক অভিজ্ঞতা এক দশকেরও বেশি সময়ের।
হাইকোর্টে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দায়িত্ব
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি হাবিবুল গনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নের মামলার শুনানিতে যুক্ত ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত বেঞ্চ তালিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টেও তিনি বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সঙ্গে গঠিত বেঞ্চে সাধারণ রিটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুনানি করেছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান নিয়েও তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানি হয়েছে। বিবাহের প্রলোভন-সংক্রান্ত বিধান বাতিলের প্রশ্নে ওই বেঞ্চ রুল জারি করেছিলেন।
এসব বিচারিক কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট হয়, হাইকোর্টে তাঁর দায়িত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সাংবিধানিক অধিকার, ফৌজদারি বিচার ও আইনগত ব্যাখ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা।
আন্তর্জাতিক আইন ও বিচার বিষয়ক অভিজ্ঞতা
বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিচারপতি হাবিবুল গনি আইন ও বিচারসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সফরে কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং ও ভারত সফর করেছেন।
আইন ও বিচারব্যবস্থার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে দীর্ঘ দেশীয় বিচারিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় আপিল বিভাগে তাঁর নতুন দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আপিল বিভাগে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ
বিচারপতি হাবিবুল গনির শপথের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে মোট পাঁচজন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের তালিকায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গনির নাম রয়েছে।
এটি বিচারিক প্রশাসনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি হলে বেঞ্চ গঠন, মামলা বণ্টন এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে আপিল বিভাগের সামনে যখন বিভিন্ন সাংবিধানিক, ফৌজদারি, দেওয়ানি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মামলা থাকে, তখন বিচারপতির সংখ্যা ও বেঞ্চ সক্ষমতা মামলা নিষ্পত্তির গতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ
আপিল বিভাগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর। হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে এই বিভাগ চূড়ান্ত বিচারিক ফোরাম হিসেবে কাজ করে। ফলে একজন হাইকোর্ট বিচারপতির আপিল বিভাগে উন্নীত হওয়া শুধু ব্যক্তিগত পদোন্নতি নয়; এটি দেশের বিচারিক কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
বিচারপতি হাবিবুল গনির ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য হলো—দীর্ঘ আইন পেশা, হাইকোর্ট বিভাগে এক দশকেরও বেশি বিচারিক অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন দেশের সর্বোচ্চ আপিল বিচারিক ফোরামে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশেষ করে সংবিধানের ব্যাখ্যা, মৌলিক অধিকার, ফৌজদারি বিচার, দেওয়ানি বিরোধ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ বিচারব্যবস্থার জন্য নজির হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই জায়গায় বিচারপতি হাবিবুল গনির দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা তাঁর নতুন দায়িত্ব পালনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সামনে যে প্রত্যাশা
বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং মামলাজট কমানো—বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় প্রত্যাশা। আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি যুক্ত হওয়ার ফলে বিচারিক কাজের পরিধি ও বেঞ্চ সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, দ্রুত ও মানসম্মত বিচার নিশ্চিত করতে মামলার কার্যকর ব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং বিচারিক প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি।
দীর্ঘ আইন পেশা ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আপিল বিভাগে প্রবেশ করা বিচারপতি মো. হাবিবুল গনির সামনে তাই একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নে বিচারিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে ন্যায়বিচার, দ্রুত বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্ব আরও কার্যকর করার প্রত্যাশা।
বিচারপতি হাবিবুল গনির আপিল বিভাগে নিয়োগকে কেবল একটি নতুন নিয়োগ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। দীর্ঘ আইন পেশা ও হাইকোর্টের বিচারিক অভিজ্ঞতার পর দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালতে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ বিচার বিভাগের ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এবং বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ, যুক্তিনির্ভর ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা।