সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন
Title :
নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন এসএনএ চার্জ ইউনিটপ্রতি আধা পয়সা—১,১৬০ মেগাওয়াটে বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বাংলাদেশে বন্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত জলবায়ু প্রকল্প। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক সোহেল রানার বিরুদ্ধে নিজ সরকারি গাড়িচালক মো. আলী হোসেন বাচ্চুকে খাস কামরায় ডেকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ রহস্য উন্মোচন ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় চারজনকে হত্যা, লাশের পাশেই গোসল-খেজুর-ইয়াবা; গ্রেপ্তার দুই চীনা দূতাবাসে হামলার হুমকি: কূটনৈতিক নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা, তৎপর গোয়েন্দারা যানজট নিয়ন্ত্রণে ড্রোন সার্ভিলেন্স, এআই ক্যামেরার পর ঢাকার ট্রাফিকে নতুন প্রযুক্তি গানভরের সঙ্গে এলএনজি চুক্তি: শুরুতে চড়া দাম, দীর্ঘমেয়াদে সস্তার আশ্বাস স্মার্টফোন, AI ও আইনজীবীর নতুন Drafting Assistant Junior Lawyer-এর Drafting দক্ষতায় আসছে নতুন পরিবর্তন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন, মধ্যরাতে প্রজ্ঞাপন

নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

  • প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা | ২৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের বাংলাদেশে সক্রিয়তা নিয়ে যে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে, তা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই সতর্কতাকে সরকার যদি কেবল ‘অনুমানভিত্তিক’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই ও মোকাবিলার বদলে রাষ্ট্র কি সংকটের অস্তিত্ব নিয়েই বিতর্কে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে?
একটি নিরাপত্তা প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তার যথাযথ তদন্ত, তথ্য-উপাত্ত যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ জঙ্গিবাদ এমন একটি হুমকি, যার ক্ষেত্রে সতর্কতার ঘাটতি পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
বিস্ফোরক উদ্ধারে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশন, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বা বিস্ফোরক উদ্ধারের খবর জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাভারে প্রেসার কুকার বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মাদারীপুরে একটি মহিলা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনাতেও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
প্রতিটি ঘটনার পেছনে জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্ত শেষ হওয়া জরুরি। কিন্তু এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ বিস্ফোরক উদ্ধার, সন্দেহজনক নেটওয়ার্কের তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ একই সময়ে সামনে এলে বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—এসব বিস্ফোরক কোথা থেকে আসছে, কারা এগুলো তৈরি বা সংগ্রহ করছে, তাদের অর্থের উৎস কী এবং কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক এর সঙ্গে যুক্ত কি না।
কারা-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দেশের কারাগারগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে কারাগার ভেঙে দণ্ডপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও বন্দি পালানোর ঘটনাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিশেষ করে জঙ্গি মামলার আসামিদের কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের সবাইকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, যারা পালিয়েছে তাদের সঙ্গে কোনো উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ হয়েছে কি না এবং তাদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব এখনো জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়।
এ অবস্থায় কারা নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের মধ্যে যদি পার্থক্য দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি আরও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত হলে তার কারণও পরিষ্কারভাবে জানানো জরুরি। অন্যথায় প্রশাসনের ভেতরে সত্য তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা: পুরোনো প্রশ্ন, নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। হিযবুত তাহরীর, জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়েছে।
কারাগার থেকে পালানো কিংবা জামিনে মুক্তি পাওয়া কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন কি না—এটি অবশ্যই ব্যক্তি ও মামলাভিত্তিক তদন্তের বিষয়। তবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি, আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং জামিন-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এই প্রশ্নটি রাষ্ট্রের সামনে থাকবেই।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও জঙ্গিবাদ মোকাবিলার রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতায় যেন কোনো ধারাবাহিকতার ঘাটতি না থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত, আদর্শ বা সংশ্লিষ্টতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু জঙ্গিবাদ মোকাবিলার প্রশ্নকে দলীয় রাজনীতির সীমায় আটকে রাখলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
জঙ্গিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের সমস্যা। তাই সরকার, বিরোধী দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে এ বিষয়ে একটি অভিন্ন জাতীয় অবস্থান গড়ে তোলা।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ কিংবা একে অপরকে দায়ী করার রাজনীতি দিয়ে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, সীমান্ত নজরদারি, কারাগারের নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ, অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধ এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে প্রবাসীরা
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে যাতায়াত, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অভিবাসনের ওপরও।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা যদি কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক পরিসরে নিজেদের দেশ নিয়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভিসা যাচাই আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। দক্ষ কর্মীদের অভিবাসন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে দেশের নিরাপত্তা ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—জঙ্গিবাদ বা নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় কোনো সাধারণ প্রবাসীর নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে তার দায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে। বিদেশে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশিকে সেই ব্যর্থতার সামাজিক বা অর্থনৈতিক মাশুল দিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
‘অস্বীকার’ নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আতঙ্ক ছড়ানো নয়, আবার সমস্যাকে অস্বীকার করাও নয়। আন্তর্জাতিক রিপোর্টে কোনো তথ্য থাকলে তা যাচাই করতে হবে। দেশে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে তার উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। কারাগার থেকে জঙ্গি বা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কেউ পালিয়ে থাকলে তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তার সম্ভাব্য নেটওয়ার্কও খুঁজে বের করতে হবে।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা ভুল তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; আবার কোনো কর্মকর্তা বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলে ধরলে কেবল সেই কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণাও তৈরি হতে দেওয়া উচিত নয়।
কারণ একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে সত্য তথ্য উপরে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আবার সংগঠিত হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, গোয়েন্দা তথ্য, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা সত্য হলে তা মোকাবিলা করতে হবে। ভুল হলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তা খণ্ডন করতে হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সমস্যাকে শুধু ‘অনুমান’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ জঙ্গিবাদ ফিরে এলে প্রথম আঘাত পড়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তায়, এরপর অর্থনীতিতে, আর শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ নাগরিকের ওপর।
আর বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা তখন সবচেয়ে আগে অনুভব করেন সেই অভিঘাত—নিজের দেশের পরিচয় দেওয়ার সময় গর্বের বদলে যখন তাদের জবাব দিতে হয়, ‘বাংলাদেশে কি আবার জঙ্গিবাদ বাড়ছে?’
এই প্রশ্নের জবাব রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়—রাষ্ট্রকে দিতে হবে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃশ্যমান ফলাফলের মাধ্যমে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট