
বিচার প্রশাসনে ধীরগতি: মামলার পাহাড়, বিচারক সংকট, শূন্য পদ পূরণে স্থবিরতা
সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মামলার জট। অথচ এই বিপুল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিচারক রয়েছেন মাত্র দুই হাজারের মতো। বর্তমানে বিচার বিভাগে প্রায় ৬০০ বিচারকের পদ শূন্য। আদালত সৃজন হলেও বিচারকের পদ সৃজন হয়নি—এমন সংখ্যা প্রায় ১৪০০। সব মিলিয়ে অন্তত ২,০০০ বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও শূন্য পদ পূরণ এবং নতুন পদ সৃজনের কার্যক্রমে চরম ধীরগতি বিরাজ করছে।
পাশাপাশি বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আটকে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বিচারিক কার্যক্রম। বিচার প্রশাসনের এই স্থবিরতার কারণে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা যেমন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তেমনি অতিরিক্ত কাজের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত বিচারকরাও।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সারা দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে ভয়াবহ বিচারক সংকট চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শূন্য পদগুলো হলো:
উদাহরণস্বরূপ, গত ছয় মাস ধরে পঞ্চগড়ের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) পদটি শূন্য। সেখানে অতিরিক্ত সিজেএমও নেই। বাধ্য হয়ে একজন সিনিয়র সহকারী জজ ভারপ্রাপ্ত সিজেএম-এর দায়িত্ব পালন করছেন, যা তার জন্য প্রশাসনিক ও বিচারিক দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন। ঠাকুরগাঁও জেলায় একমাত্র অতিরিক্ত জেলা জজের পদটিও এক বছর ধরে শূন্য।
বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস বিধিমালা অনুযায়ী, আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের কাজ করে থাকে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাঠানোর পর সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভা ও জিএ (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কমিটির মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হয়।
তবে সূত্র জানায়, বিগত আট মাসে মাত্র একটি ফুল কোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রায় একশ সিভিল জজকে সিনিয়র সিভিল জজ পদে পদোন্নতি, বেশ কয়েকজন বিচারকের অবসর-পূর্ব বদলি এবং বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফাইল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে পাঠানো হলেও সেগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফাইল জমে থাকায় অনেক শূন্য পদ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিচার বিভাগের পদ সৃজনের ক্ষমতা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির হাতে। ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই কমিটি ২৬২ জন বিচারকের পদ সৃজন করলেও, গত এক বছরে নতুন কোনো পদ সৃজন হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ১৭০০-এর বেশি নতুন কোর্ট সৃজন করা হলেও, প্রায় ১৪০০ বিচারকের পদ এখনো সৃজন করা হয়নি। এর মধ্যে যুগ্ম জেলা জজের ৩৬৭টি, অতিরিক্ত দায়রা জজের ২০৪টি এবং পারিবারিক আদালতের ১৬৩টি পদ আটকে আছে।
নতুন বিচারক নিয়োগের পর ফাউন্ডেশন বা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় ৩০০ সিভিল জজ এই প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিচারকাজ চালাচ্ছেন। ১৫তম, ১৬তম এবং ১৭তম বিজেএস-এ নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক বিচারকের চাকরির মেয়াদ ১ থেকে ৩ বছর হতে চললেও তাদের প্রশিক্ষণ হয়নি।
এছাড়া পদোন্নতি পাওয়া বিচারকদের জন্য নিয়মিত ‘রিফ্রেসার্স ট্রেনিং’ আয়োজনের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। জুডিশিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে লোকবল ও জায়গা সংকটের কারণে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে অধস্তন আদালতে কর্মরত ২,২৩৩ জন বিচারকের মধ্যে প্রেষণে আছেন প্রায় ৩০০ জন। ফলে মাঠে কর্মরত আছেন মাত্র ২,০০০ বিচারক। এই বিচারকদের ঘাড়ে গড়ে প্রায় ২,০০০ মামলার বোঝা। অথচ বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের মতে, একজন বিচারকের অধীনে সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে ১,০০০ মামলা থাকা উচিত।
জনসংখ্যার অনুপাতেও বাংলাদেশে বিচারকের সংখ্যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন:
|
দেশ |
বিচারক প্রতি জনসংখ্যা |
|---|---|
|
যুক্তরাজ্য |
৩,১৮৬ জন |
|
যুক্তরাষ্ট্র |
১০,০০০ জন |
|
ভারত |
৪৭,৬১৯ জন |
|
পাকিস্তান |
৫০,০০০ জন |
|
বাংলাদেশ |
৯০,০০০ জন |
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, “অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি বিচার বিভাগের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। বর্তমানে ১৮তম বিজেএসের ভাইভা চলছে যার মাধ্যমে ২০০ জন বিচারক নিয়োগ পাবেন এবং ১৯তম বিজেএসের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়েছে। জিএ কমিটি ও ফুল কোর্ট সভার জন্য জমা থাকা ফাইলগুলো শিগগিরই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে।”
অন্যদিকে, আইন উপদেষ্টা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে আমরা শুধু প্রস্তাব পাঠাই। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১,৪০০ বিচারককে বদলির প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু ৭০ শতাংশ প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্ট থেকে অনুমোদন পায়নি। আসলে মন্ত্রণালয় থেকে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।”
আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক পরিস্থিতি সম্পর্কে
উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২,০০০ বিচারক দিয়ে সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ৪০ লাখ মামলার জট মানে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে। দেশে অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ এই বিচারে দীর্ঘসূত্রতা। বিচারক নিয়োগ ও পদ সৃজন ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।”