1. multicare.net@gmail.com : আদালত বার্তা :
সিটি করপোরেশন: সংবিধানসম্মত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন - আদালত বার্তা
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৩:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সিটি করপোরেশন: সংবিধানসম্মত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন দেড় বছরে ১৫ বিচারপতির বিদায়, অন্যদের জন্য ‘সতর্কবার্তা সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জা’মিন স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। শাহবাগে এক নারীর একক প্রতিবাদ: “ঢাকা বাঁচাতে হকার উচ্ছেদ জরুরি”—বিতর্কের কেন্দ্রে নতুন প্রশ্ন আইন অঙ্গনে টিকে থাকার লড়াই: একজন দক্ষ আইনজীবীর করণীয় ট্রাইব্যুনালে এলেই অসুস্থতা: বিচার এড়াতে ‘রোগের নাটক’, বলছে প্রসিকিউশন ঢাকায় সাংবাদিকতা সম্মেলনে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের তাগিদ ঢাকা-ইসলামাবাদ সমঝোতা, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ঘিরে পাকিস্তানের নতুন বার্তা, হাইকোর্টে একদিনে ৫ হাজারেরও বেশি মামলা নিষ্পত্তি চীন সফরে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী — তিস্তা সমস্যা নিয়ে ভারতের জন্য বসে থাকা চলবে না

সিটি করপোরেশন: সংবিধানসম্মত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

 

সিটি করপোরেশন: সংবিধানসম্মত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ ১৩ মে, ২০২৬
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হবার কথা। জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে। সরকারের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব দিয়েছে আমাদের সংবিধান। জাতীয় সংসদে যেমন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করবেন, তেমনি স্থানীয় সরকার পরিচালিত হতে হবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।
অর্থাৎ ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ এবং শহরে নির্বাচিত সিটি করপোরেশন শাসনকার্য পরিচালনা করবে। বস্তুত, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতে, স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা [কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ডিএলআর(এসি)(১৯৯২)]।
বাংলাদেশে সংবিধান সর্বোচ্চ আইন।
সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য পূর্ণ আইন অসাংবিধানিক হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু সংবিধান লঙ্ঘন করে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চলছে মনোনীত ব্যক্তিদের দ্বারা। এটি সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন। শুধু সংবিধানে লঙ্ঘন নয়, এভাবে প্রশাসন দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা আদালত অবমাননাও বটে। কারণ, ১৯৭২ সালের সংবিধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হবার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা করা হয়নি।
১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর এই বিষয়টি আদালতে উত্থাপন করেন একজন নাগরিক। দীর্ঘ শুনানির পর, আদালত সবস্তরের স্থানীয় পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। 
আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, প্রশাসক এবং মনোনীত ব্যক্তি দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা অবৈধ।
আপিল বিভাগের রায়ে আরো বলা হয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে যুক্তি সংগত কারণে আপিল সরকারে প্রশাসক নিয়োগ স্থানীয় যেতে পারে। তবে তা যেন সবচেয়ে স্বল্প সময়ের জন্য হয় এবং এসব প্রশাসকরা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু এখন বিএনপি সরকার মনোনীত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে বসে রুটিন দায়িত্বের চেয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কোন এলাকা সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার মনোনীত প্রশাসকদের নেই। আপিল বিভাগের রায়ে অনির্বাচিত ব্যক্তি’ কেবল দৈনন্দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন’ বলে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আপিল হয়েছে। কিন্তু মনোনীত প্রশাসকদের রুটিন কাজেই মনোযোগ নেই।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মতে, ‘যদি সরকারি কর্মকর্তা বা তাদের তল্পিবহদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হয়’, তথা সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত না হয়, ‘তাহলে এগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না’ (কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছর সময় অতিবাহিত হতে চলেছে, এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার পরিচালিত হচ্ছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা। একদিকে তাদের যেমন জবাবদিহিতা নেই অন্যদিকে তারা আপিল বিভাগের নির্দেশনা অমান্য করে একের পর এক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন জনগণের ওপর।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে নেই কোনো জনপ্রতিনিধি। ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ৩৩০টি পৌরসভাও চলছে জনপ্রতিনিধি ছাড়া, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের খণ্ডকালীন দায়িত্বে। শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র রয়েছেন। তবে এখানেও নেই কোনো কাউন্সিলর। সব মিলিয়ে জনপ্রতিনিধিহীন অবস্থায় আছে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ, পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। এসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না দিলে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়ে থাকে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে; এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুন। সেই হিসাবে গত বছরের ১ জুন এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুন। এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া এভাবে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সিটি কর্পোরেশন চালানো অসাংবিধানিক। 
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছিল। এবার সেটিও মানা হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার নিয়ে প্রথম অসাংবিধানিক কাজটা করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪; জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ ও উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ জারি হয়। এতে বিশেষ পরিস্থিতি বা জনস্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের সুযোগ তৈরি করা হয়। যদিও বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি সরকারের হাতে দেওয়া হয়। 
চারটি অধ্যাদেশের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আইনের অন্যান্য ধারার ওপর প্রাধান্য দিয়ে (যা কিছুই থাকুক না কেন) সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়। ফলে আগের মতো নির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যাকে খুশি তাকে, যখন খুশি তখন অপসারণের পথ খুলে যায়। স্থানীয় সরকারের আইনে সংশোধনী আনার আগে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের স্পষ্ট শর্ত ছিল। সেখানে কোনো প্রতিনিধি যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া টানা তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে তাকে অপসারণের সুযোগ ছিল। রাষ্ট্র বা পরিষদের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া যেত। নৈতিক স্খলনের অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হলে পদ হারানোর বিধান ছিল।
তখনকার বিধান অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি, শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা, অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হলেও অপসারণ সম্ভব ছিল। নির্বাচনের পর অযোগ্যতা প্রমাণিত হলেও একই ব্যবস্থা নেওয়া যেত। বার্ষিক নির্ধারিত সভায় উপস্থিত না থাকা বা সভা আয়োজন না করাও অপসারণের কারণ ছিল। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দেওয়া বা মিথ্যা তথ্য দিলে ছয় মাসের মধ্যে তা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
এ ছাড়া কাউন্সিলর বা সদস্যদের অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কোনো জনপ্রতিনিধিকে অপসারণের সুযোগ ছিল। কারও বিরুদ্ধে অপসারণ প্রক্রিয়া শুরু হলে বা ফৌজদারি মামলায় আদালত অভিযোগ গ্রহণ করলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার বিধানও ছিল, অর্থাৎ আগে অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। কিন্তু ইউনুস সরকারের আইন উপদেষ্টা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই অধ‍্যদেশ তৈরি করেছিলেন। 
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক, এই অধ্যাদেশকে একটি বাজে আইন হিসেবে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারে কেন্দ্রীয় সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।’ 
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিএনপির এই অধ্যাদেশকে পাশ করেছে। অথচ এটি বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
৩১ দফার ২১ নম্বর দফা হলো, ‘বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বশাসিত ও ক্ষমতাবান করা’। এতে মৃত্যুজনিত কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ না করা এবং আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশ বলে বরখাস্ত বা অপসারণ না করার কথা বলা হয়। ইশতেহারেও বিএনপি একই কথা বলেছে। কিন্তু নির্বাচিত হবার পর, নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফার অঙ্গীকার পাশ কাটিয়ে বিএনপি এখন প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার চালাচ্ছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর ইতিমধ্যে ৫৬টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। রাজধানীর ২টিসহ দেশের ১১ সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই বিএনপির নেতা। স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। পাশাপাশি তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট