
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ২৯ আগস্ট ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন এবং তথাকথিত ‘প্রাঙ্ক’ বা বিনোদনমূলক ভিডিও বানানোর নামে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির এক ভয়ংকর প্রবণতা সম্প্রতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে খেলনা বন্দুক হাতে দুই তরুণের ঘুরে বেড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অভিনয় করে ধারণ করা একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ভিডিওটি নির্মাতাদের দাবি, এটি নিছকই ‘ফানি ভিডিও’ বা মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তৈরি। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনোদনের মোড়কে এটি কেবল একটি স্থূল রসিকতাই নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইনে এটি একটি সুস্পষ্ট ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কালো রঙের লম্বা কুর্তা-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরিহিত দুই তরুণ (লিমন তোহা ও ইয়াসিন) কালো রঙের দুটি বড় বন্দুক হাতে নারায়ণগঞ্জের সিটি পার্কে (সাবেক শেখ রাসেল নহর পার্ক) এবং ব্যস্ত সড়কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সামনে রিকশাচালক, পথচারী বা শিশু যাঁকেই পাচ্ছেন, হঠাৎ তাঁর দিকেই বন্দুক তাক করছেন। অনেকেই এতে থমকে যাচ্ছেন, কেউ আতঙ্কে সরে যাচ্ছেন।
টিকটকে ‘ভাইবোন’ এবং ইনস্টাগ্রামে ‘লিমন সিন্স ২০০৪’ নামক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রথম ছড়ানো হয়। ভিডিওর নির্মাতা লিমন তোহার দাবি, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাটক ও টিকটক ট্রেন্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি এটি বানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বন্দুকটি ছিল খেলনা এবং তিনি মানুষের ভয়ের অংশটুকু প্রচার করে পরে তাঁদের হাসিমুখের দৃশ্যগুলো কেটে দিয়েছেন।
আইনি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের একাধিক প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। খেলনা অস্ত্র ব্যবহার করা হলেও সাধারণ মানুষের মনে মৃত্যুভয় বা আঘাতের আতঙ্ক তৈরি করা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়।
ভিডিও নির্মাতা লিমনের দাবি, ভিডিও ধারণের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল এবং খেলনা বন্দুক বুঝতে পেরে তারা কিছু বলেনি। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো ভিডিও বা ঘটনার বিষয়ে তাঁরা অবগত নন এবং পার্ক কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও কিছু জানাননি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
প্রকাশ্যে এমন একটি স্পর্শকাতর মহড়া চলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি না থাকাটা প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ডিজিটাল যুগে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের নামে অন্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি বিঘ্নিত করার কোনো অধিকার কারও নেই। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বা টিকটকের ‘ভিউ’ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় দেশের আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের এই প্রবণতা কঠোর হস্তে দমন করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক গতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের ‘প্রাঙ্ক’ ভিডিওর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বপ্রণোদিত (Suo Moto) আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।