
কক্সবাজারে সন্তান হারানো নিউজিল্যান্ডের পরিবার ৫০ দিন পর ছাড়লো বাংলাদেশ: নৌযানডুবি ও ডাকাত হামলার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বিদায়
কক্সবাজার প্রতিনিধি | আদালত বার্তাঃ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে সলিলসমাধি হয়েছে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নের নৌযানের; সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ বছর বয়সী প্রিয় সন্তান। সাগরে ট্র্যাজেডি, দুর্বৃত্তদের হামলা এবং একের পর এক আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে দুঃসহ শোক বুকে নিয়ে কক্সবাজার ছাড়ল নিউজিল্যান্ডের এক পর্যটক পরিবার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ৭৪ বছর বয়সী জন এডওয়ার্ড পুডনি, তাঁর স্ত্রী বেলা (৩৬) এবং ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলে রালফ। সেখান থেকে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁদের। এর আগে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকা পর্যটন মোটেল ‘শৈবাল’ থেকে আবেগঘন পরিবেশে বিদায় নেন তাঁরা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান। দীর্ঘ ৫০ দিন সার্বক্ষণিক পাশে থাকায় বিদায়লগ্নে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলেন পরিবারের সদস্যরা।
যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক নৌযানডুবি:
বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে কাঠের তৈরি বিশেষ নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’-এ করে সাগরে ভাসছিল পরিবারটি। গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের নাজিরারটেক ও সোনাদিয়া দ্বীপের মধ্যবর্তী বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে তাদের নৌযানটি ডুবে যায়। খবর পেয়ে কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে জন এডওয়ার্ড পুডনি, তাঁর স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করলেও নিখোঁজ হয় বড় ছেলে আলবার্ট (১৬)।
পরদিন বিকেলে সমিতি পাড়াসংলগ্ন সৈকত থেকে আলবার্টের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর আলবার্ট সাঁতার জানত না। নৌযানডুবির সময় তার লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকমতো আটকানো না থাকায় সে পানিতে ভেসে থাকতে পারেনি বলে পরিবারের ধারণা।
আইনি প্রক্রিয়া ও শেষকৃত্য:
বিদেশি নাগরিকের অপমৃত্যু হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর আলবার্টের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে ১৫ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ড দূতাবাস ও পরিবারের সম্মতিতে কক্সবাজার শহরের একটি হিন্দু শ্মশানে তার দাহ সম্পন্ন হয়। তবে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও পাসপোর্ট হারানো, নতুন ট্রাভেল ডকুমেন্ট প্রস্তুত, ভিসা ও বিমানের টিকিটসংক্রান্ত দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার কারণে পরিবারটিকে আরও প্রায় এক মাস কক্সবাজারে অবস্থান করতে হয়।
আবাসন ও প্রশাসনিক সহযোগিতা:
দুর্ঘটনার পর থেকেই পরিবারটির নিরাপত্তা ও থাকার ব্যবস্থা করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। পর্যটন মোটেল শৈবালে তাঁদের জন্য এক মাসেরও বেশি সময় সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। মোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ জানান, ৫০ দিনে থাকা, খাওয়া ও লন্ড্রি বাবদ পরিবারটির মোট বিল এসেছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা (কক্ষ ভাড়ায় ২০% ছাড়সহ)। বিল পরিশোধ সংক্রান্ত যাবতীয় প্রতিবেদন শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড হাইকমিশনের কনস্যুলার কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রথম দফায় জলদস্যু হামলা, দ্বিতীয় দফায় প্রাণহানি:
পরিবারটির ওপর দুর্যোগ নেমে এসেছিল আরও আগেই। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বৈরী আবহাওয়ায় মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় তাদের নৌযানটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেয়। সেখানে গভীর রাতে স্থানীয় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয় পরিবারটি। ডাকাতরা তাদের ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট ও বৈদেশিক মুদ্রাসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে এবং পরে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে খোয়া যাওয়া অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করে পুলিশ।
সেই ক্ষতি সামলে ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত আইনি জটিলতা মেটাতে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথেই ২৫ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় চরম দুর্ঘটনার শিকার হয় তারা। এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি কিশোর আলবার্টের। সন্তান হারানোর চিরস্থায়ী ক্ষত আর একের পর এক ট্র্যাজেডির দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাড়ল পর্যটক পরিবারটি।