
বাংলাদেশে বন্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত জলবায়ু প্রকল্প।
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ২৩ আগস্ট ২০২৬
সহায়তা হ্রাসের কারণে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত একটি জলবায়ু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হতে যাচ্ছে। এতে হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোও ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) এ তথ্য তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর (এফসিডিও) বর্তমানে বিদেশি সহায়তার বাজেট কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তার বাজেট মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামবে।
কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সহায়তা সম্পর্ক প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই কাটছাঁটকে ‘নৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জলবায়ু প্রকল্পে যুক্তরাজ্যের সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে।
এর প্রভাবে পড়েছে ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। ২০২৩ সাল থেকে সংস্থাটি বাংলাদেশে একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের একটি অংশ পরিচালনা করে আসছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, জলজ চাষের উপকরণ ও প্রযুক্তি এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম আবহাওয়া তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষের জীবন পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটির।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোয়ারভাটা-নির্ভর ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়। সুন্দরবনের বড় একটি অংশ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল।
তবে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানান, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংস্থাটিকে বলা হয়, চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বন্ধ করতে হবে। সংস্থাটির জোরালো প্রচেষ্টার পর সেই সময়সীমা পরে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
রহমান বলেন, ‘২০২৬ সাল পর্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা এর চেয়ে ‘অনেক কম’ অর্থ পেয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৩৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই আকস্মিক কাটছাঁটের কারণে কমিউনিটির মধ্যে আমাদের যে সুনাম গত আড়াই বছরে আমরা সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করেছি, তা হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা যে উদ্যোগগুলো নিয়েছি, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কার্যকরভাবে প্রকল্প থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনা করার সক্ষমতা সীমিত হয়েছে।’
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের প্রকল্পে অর্থ কমানো যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কর্মসূচিতে সামগ্রিক কাটছাঁটের একটি অংশ। জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশকে দেয়া দ্বিপক্ষীয় সহায়তার পরিমাণ ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থেকে কমে ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নামবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিতে সুন্দরবনের মানুষপ্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতি আরও বেশি হবে বলে মনে করেন রহমান। কারণ, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রকল্পের আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠীর আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর আমরা আরও তীব্র ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় দেখছি, একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মাটি লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের অর্থায়নের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, অথচ বাস্তব ও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কমছে।’
লেবার পার্টির এমপি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প যদি স্বল্প নোটিশে দুই বছর আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দুর্বল ফল দিতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
বছরে ৩ সেন্টিমিটার বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হওয়ার আগে যে বদ্বীপ তৈরি করেছে, তার ওপর অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার। এখানে বিপন্ন বাঘ ও নদীর ডলফিনসহ ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহায়তা পাওয়া মানুষজন এই অনন্য পরিবেশগত এলাকার প্রান্তে বসবাস করেন। ঐতিহ্যগতভাবে তারা মাছ, জ্বালানি কাঠ ও মধুসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই এখন কৃষিকাজও করেন। তবে ব্যাপক নিরক্ষরতা এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনীতি থেকে তাদের ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
২০০৯ সালে সুন্দরবনে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার পরও অনেকে এর প্রভাব বহন করছেন। ওই ঘূর্ণিঝড়ে আনুমানিক এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্থানীয় অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি কিছু এলাকার ভূপ্রকৃতিও পুরোপুরি বদলে যায়। সুন্দরবনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। দ্রুত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উর্বর জমি।
দাতব্য সংস্থাটির কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা আসার পর তাদের কমিউনিটির কিছু সদস্য কেঁদে ফেলেন। আবার অন্যরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে, ঠিক যখন বিভিন্ন উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে শুরু করেছে, তখনই কেন সহায়তা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৪০ উদ্যোক্তার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগও ছিল। প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এখন তাদের ছেড়ে দিলে তারা আবার ‘শূন্য অবস্থায়’ ফিরে যাবেন বলে মনে করেন রহমান। কারণ, বাজার সম্পর্কে তাদের কেবল ‘ন্যূনতম ধারণা’ দেয়া হয়েছে। রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত চলার কথা স্পষ্ট থাকার পরও দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে সবকিছু গুটিয়ে নেয়া খুব কঠিন।’
নতুন অর্থায়ন খোঁজার সময়ও নেই১৭ কোটি মানুষের দেশে বিদেশি সরকারের অনুদান দিয়ে প্রয়োজন থাকা প্রত্যেক মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন রহমান। এ কারণে যুক্তরাজ্যের মতো দাতা দেশগুলোর বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নতুন ধরনের অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থ আনার উদ্যোগকে তিনি বোধগম্য বলে মনে করেন।
তবে তিনি বলেন, ‘একই সময়ে আমরা যখন বাংলাদেশের
সবচেয়ে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের কথা বলছি, তখন বেসরকারি মূলধন কীভাবে সেখানে আসবে, তা বোঝা খুব কঠিন। মানুষের উল্লেখযোগ্য আর্থিক আয় নেই এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে যোগাযোগ ও অবকাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে।’
অন্যান্য বেসরকারি সংস্থাও রহমানের উদ্বেগের সঙ্গে একমত। গত বছর এনজিও মার্সি কর্পস জানিয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন অর্থায়নের প্রয়োজনের মাত্র ৩ শতাংশ এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাত পূরণ করেছে। বন্যা প্রতিরোধের মতো উদ্যোগকে সাধারণত ‘জনকল্যাণমূলক’ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেগুলো নির্মাণে প্রয়োজন সরকারি অর্থও।