
আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে মো. হাবিবুল গনির নিয়োগ: কর্মজীবন ও একটি যুগান্তকারী রায়ের পর্যালোচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক,আদালত বার্তাঃ২৮ আগস্ট ২০২৬।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। দিনটি তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। তাঁর এই অর্জন বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
জীবনী ও কর্মজীবন
বিচারপতি হাবিবুল গনি ১৯৬২ সালের ৩১ মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস এবং আইন ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল তিনি জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তাঁর আইন পেশা শুরু করেন। এরপর ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তাঁর দক্ষতা ও সততার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে, ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত হলেন।
উল্লেখযোগ্য রায়সমূহ
বিচারপতি হাবিবুল গনি তাঁর কর্মজীবনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
এনআই অ্যাক্ট সংক্রান্ত যুগান্তকারী রায়ের পর্যালোচনা
বিচারপতি হাবিবুল গনি কর্তৃক প্রদত্ত এনআই অ্যাক্ট-এর ১৪০ ধারা অনুযায়ী অপরাধ সংক্রান্ত একটি বিখ্যাত রায় । এই রায়টি DLR 72 (HD) 134 এবং BLD 38 (HD) 208 রেফারেন্স ভুক্ত হয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
ঘটনার পটভূমি:
মেসার্স ইব্রাহিম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবসায়িক লেনদেনের দেনা পরিশোধের জন্য কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফখরুল আলম (২ নং আসামি) মোট ৬,১১,৮২,০৩২/- টাকার দুটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু ব্যাংকে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় চেক দুটি ডিজঅনার (Dishonoured) হয়। পাওনা আদায়ের জন্য নোটিশ প্রেরণের পরও টাকা পরিশোধ না করায় বাদী লুৎফুন্নাহার লাভলী নারায়ণগঞ্জের আদালতে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ১৩৮ ও ১৪০ ধারার অধীনে কোম্পানি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অন্যান্য পরিচালকসহ (বর্তমান পিটিশনারগণ) মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে সিআর মামলা (পরবর্তীতে দায়রা মামলা নং ৪৭৬/২০১৭) দায়ের করেন। অভিযুক্ত পরিচালকগণ (আসামি ৩ থেকে ৬) হাইকোর্টে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারার অধীনে মামলাটি বাতিলের (Quashment) আবেদন করেন।
আইনি যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ:
পিটিশনারদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় যে, তাঁরা কোম্পানির কেবল পরিচালক (এবং এমডির ভাই); কিন্তু তাঁরা চেক প্রদানকারী বা স্বাক্ষরকারী নন এবং কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না। মামলার নথিতে (Complaint petition) তাঁদের বিরুদ্ধে কোম্পানির কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ দায়িত্ব বা জড়িত থাকার কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়নি।
এনআই অ্যাক্ট-এর ১৪০ ধারা অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময়ে যে ব্যক্তি কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিচালনার দায়িত্বে বা ভারপ্রাপ্ত (in charge of, and responsible for the conduct of the business) ছিলেন, কেবল তিনিই দায়ী হবেন। মহামান্য আদালত AKM Siddique Vs Md. Momenul Haque (11 BLC 454) এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের SMS Pharmaceuticals Ltd. Vs Neeta Bhalla মামলার নজির অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করেন যে, অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে সংশ্লিষ্ট পরিচালক অপরাধের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।
আদালতের সিদ্ধান্ত:
মহামান্য আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, শুধুমাত্র একটি কোম্পানির “পরিচালক” হওয়ার কারণেই কোনো ব্যক্তিকে চেক ডিজঅনারের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা ফৌজদারি দায় (Vicarious liability) চাপিয়ে দায়ী করা যায় না। যেহেতু বর্তমান পিটিশনারগণ চেকের স্বাক্ষরকারী নন এবং অভিযোগপত্রে তাঁদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব উল্লেখ নেই, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে এই মামলা চালানো আইনের অপব্যবহার।
চূড়ান্ত আদেশ:
মহামান্য হাইকোর্ট রুলটি অ্যাবসলিউট (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। এর ফলে বর্তমান পিটিশনারদের (আসামি ৩ থেকে ৬) বিরুদ্ধে দায়রা মামলা নং ৪৭৬/২০১৭-এর যাবতীয় কার্যক্রম বাতিল (Quashed) করা হয়। তবে, ১ নং আসামি (কোম্পানি) এবং ২ নং আসামি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)-এর বিরুদ্ধে মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে বলে আদালত নির্দেশ দেন।
বিচারপতি হাবিবুল গনির এই রায়টি কর্পোরেট দায়বদ্ধতা এবং এনআই অ্যাক্টের অপব্যবহার রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হিসেবে কাজ করছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে তাঁর নিয়োগ বিচার বিভাগের জন্য আরও বড় সাফল্য নিয়ে আসবে বলে আশা করা যায়।