
অবশ্যই। ইমেজে দেওয়া একাত্তর টেলিভিশনের শিরোনাম—“দেশীয় পর্যটনে খরচ বেশি, আগ্রহ বাড়ছে বিদেশ ভ্রমণে”—
দেশীয় পর্যটনে ব্যয় বেশি, বাড়ছে বিদেশ ভ্রমণের আগ্রহ
পর্যটন খাতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, পিছিয়ে পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন
আদালত বার্তা ডেস্ক:৮ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা—দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক ভ্রমণপিপাসু বাংলাদেশি একই ধরনের বাজেটে বিদেশের গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। বিমানভাড়া, আবাসন, খাবার ও অন্যান্য সেবার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকদের একটি অংশ মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে ভ্রমণ করলে প্রতিবেশী ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে ঘুরে আসা অনেক সময় দেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের কাছাকাছি ব্যয়ে সম্ভব।
সম্প্রতি একাত্তর টেলিভিশনের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামেও বিষয়টি উঠে এসেছে—“দেশীয় পর্যটনে খরচ বেশি, আগ্রহ বাড়ছে বিদেশ ভ্রমণে।” বিষয়টি নতুন নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদন ও খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও বাংলাদেশের পর্যটনসেবার মূল্য, মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশ ভ্রমণে ব্যয়ের সুযোগও বেড়েছে
বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের নীতিতেও সাম্প্রতিক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা ১২ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত প্রয়োজন বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এরপর অক্টোবরে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্রমণ কোটায় একবারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ডলার বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়, যা আগে ছিল ২ হাজার ডলার।
অর্থাৎ বিদেশ ভ্রমণ পুরোপুরি কমে যাচ্ছে—এমন সরল চিত্রের বদলে ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কাঠামোতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এক মাসে বিদেশে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা কার্ডে খরচ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশিরা বিদেশে আন্তর্জাতিক ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এর বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ডভিত্তিক ব্যয় ছিল প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের কার্ডভিত্তিক ব্যয় ছিল দেশের ভেতরে বিদেশিদের ব্যয়ের প্রায় চার গুণ।
আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের এই বিদেশি ব্যয়কে মাসিক হিসাবে ধরলে বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় ভ্রমণ, কেনাকাটা ও অবকাশযাপন—বিভিন্ন কারণেই বাংলাদেশিদের বিদেশমুখী ব্যয় হচ্ছে।
তবে কার্ডভিত্তিক ব্যয়ের পুরোটা পর্যটন ব্যয় নয়—এ বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। তাই এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি শুধু পর্যটন ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দেশের পর্যটনে কেন এই চাপ?
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটন মৌসুমে হোটেল-রিসোর্টের ভাড়া, খাবার, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য সেবার মূল্য বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যোগাযোগব্যবস্থা, পার্কিং, পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশমূল্যসহ বিভিন্ন খরচ।
অন্যদিকে বিদেশের কিছু গন্তব্যে আগে থেকে প্যাকেজ বুকিং, সাশ্রয়ী বিমানভাড়া, তুলনামূলক কম আবাসন ব্যয় এবং উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণে সামগ্রিক বাজেট অনেক সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিদেশ ভ্রমণের ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিমান টিকিট, ভিসা, হোটেল, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াতকে প্রধান খরচের খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে দেশীয় ও বিদেশি পর্যটনের ব্যয় তুলনা করে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কিছু পর্যটনকেন্দ্রে আবাসন ও অন্যান্য সেবার মূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
বিদেশি পর্যটক কমছে, বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—একদিকে দেশের নাগরিকদের একটি অংশ বিদেশে অর্থ ব্যয় করছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের আগমনও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জন এবং ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন। অর্থাৎ ২০২৫ সালে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
বিশেষ করে ভারতীয় দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৬ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও আয় বাড়ছে না
বাংলাদেশের রয়েছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নদী-হাওর-বাঁওড়, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ বৈচিত্র্যময় পর্যটনসম্পদ। কিন্তু অবকাঠামো, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, সেবার মান, প্রচারণা এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় ২০২৩ সালের ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে ২০২৪ সালে কমে ৪৪ কোটি ডলারে নেমেছে।
দেশীয় পর্যটন বাঁচাতে প্রয়োজন মানসম্মত সেবা
বিশেষজ্ঞ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় পর্যটকদের বিদেশমুখিতা ঠেকাতে শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; পর্যটনসেবার মূল্য, মান, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে পর্যটন মৌসুমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত, সহজ ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইনভিত্তিক স্বচ্ছ মূল্যতালিকা চালু করা প্রয়োজন।
দেশের পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করা গেলে একদিকে যেমন দেশীয় পর্যটকদের দেশে রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও বাড়বে।
আদালত বার্তার পর্যবেক্ষণ:
দেশের মানুষ ভ্রমণ করতে চান—এটি অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু সেই ভ্রমণ যদি ক্রমেই বিদেশমুখী হয় এবং দেশে একই অর্থে তুলনামূলক কম মানের সেবা পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি শুধু পর্যটন শিল্পের নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা,
কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই পর্যটনকে কেবল বিনোদনের খাত হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য এবং সাম্প্রতিক দেশীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।