শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ অপরাহ্ন
Title :
মেট্রো রেখে মনোরেলে মনোযোগ “ওকালতি পেশার মূলমন্ত্র হলো গুরু শিক্ষা” আইনজীবীর মাথা ফাটানো বিচারককে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার উদ্যোগ ঢাকার ৪১৬ বছরপূর্তি উপলক্ষে  ‘হৃদয়ে ঢাকা’ কর্মসূচিতে ঐতিহ্য ও নাগরিক চেতনার নতুন উদযাপন আইনজীবীর মাথায় পেপার ওয়েট ছুড়ে বিচারিক ক্ষমতা হারালেন সেই বিচারক যে কারণে পদত্যাগ করতে হচ্ছে রাষ্ট্রপতিকে, জানা গেল কারণ এক বছরে ২৫ লাখে মামলা কমানোর চেষ্টা সরকারের: আইনমন্ত্রী আলোচনায় হাসিনার দেশে ফেরা চলছে নানা গুঞ্জন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন না, জানালো ইসি  সাংবাদিকতার পেশায় আইনি জ্ঞান ও পেশাগত দায়বদ্ধতা: সত্য অনুসন্ধানের অপরিহার্য ভিত্তি

মেট্রো রেখে মনোরেলে মনোযোগ

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

মেট্রো রেখে মনোরেলে মনোযোগ
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬
হওয়ার কথা ছয়টি। হয়েছে শুধু একটি। তাও পূর্ণ পথ পাড়ি দিতে পারছে না। সব ঠিক থাকলে আসছে বছর মতিঝিলের মেট্রো পৌঁছাবে কমলাপুর। মেট্রোরেলের অন্যান্য পথের নির্মাণকাজ অনেকটা স্থবির। টুকটাক কাজ হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। সরকারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে মনোরেল।
নগর পরিবহনের বাইবেল বলা হয় কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাকে (এসটিপি)। দফায় দফায় সংশোধন করে ২০১৫ সালে এই পরিকল্পনা (আরএসটিপি) চূড়ান্ত হয়, যা কার্যকর থাকার কথা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। সেটি আবারও সংশোধন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। মনোরেলকে অন্তর্ভুক্ত করতেই এ উদ্যোগ। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আপডেটিং দ্য রিভাইসড স্ট্র্যাজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ফর ঢাকা’। এতেই ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে পাঁচটি রুটে মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এ পরিবহন পরিকল্পনা দ্রুতই মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উঠবে বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মনোরেলের জন্য শুরু হয়েছে প্রাথমিক কাজ। ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলোকেও আনা হবে মনোরেলের আওতায়। প্রাধান্য পাচ্ছে সাভার ও ভুলতার মতো জায়গাও। প্রথমে দুটি রুট দিয়ে শুরু হবে নির্মাণকাজ। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট)। কোন কোন জায়গায় যাত্রী ওঠানামার জন্য স্টেশন নির্মাণ করা হবে— সেটি ঠিক হবে প্রাথমিক সমীক্ষা শেষে। এর আগে নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে না।
উল্টো দিকে চলমান থাকা দুটি পাতাল মেট্রোরেলের কাজ যেন থেমে আছে। এরই মধ্যে মেট্রোরেল লাইন-১-এর নির্মাণকারী ঠিকাদারদের একটি প্রতিষ্ঠান কাজিমা করপোরেশন কাজ করবে না জানিয়ে ফিরে গেছে জাপান। অন্যান্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নির্ধারিত সময়ের চুক্তি হয়নি। আরেকটি মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর), যা হেমায়েতপুর-গাবতলী-মিরপুর-১০ হয়ে ভাটারা পৌঁছানোর কথা। এ লাইনের কাজেরও একই অবস্থা। অন্যটি মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ), যা গাবতলী-রাসেল স্কয়ার-অাফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি যাবে। মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) পথের নির্মাণকাজ মোটামুটি বাতিলের পথে। এসব নিয়ে বিনিয়োগকারী ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসন্তোষ। এ স্থবিরতার শুরু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তাদের কথায় নির্মাণ ব্যয় ছিল বেশি— তাই খরচ না কমিয়ে বাস্তবায়নের পথে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেই যুক্তিতেই আটকে আছে নতুন সরকার।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় প্রকল্পগুলো মাঝপথে গতি হারালে আদতে জনগণের অর্থের ক্ষতি। বড় পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সব সরকারের নীতি এক থাকলে দিন শেষে প্রকৃত সুফল পায় জনগণ। মেট্রোকে থামিয়ে মনোরেলে গেলে মৌলিক সুফল মিলবে না বলে তারা মনে করছেন।
যদিও মেট্রোরেল ও মনোরেল সাংঘর্ষিক নয় বলে সাফ জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। আগামীর সময়ের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছিলেন, ‘সরকার মনোরেলের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু মেট্রোর কাজও চলবে। এখানে মেট্রো-মনো সাংঘর্ষিক নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। আমরা চাই মেট্রো থেকে নেমে একজন যাত্রী যেন মনোরেলে উঠতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে। মেট্রোরেল ও মনোরেলের মিশ্রণে একটি শক্তিশালী গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।’
ঢাকার বিদ্যমান নগর পরিবহন ব্যবস্থায় মনোরেলকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি মনে করছেন, ‘আরএসটিপিতে গণপরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে যে নকশা করা আছে— সেটি বাস্তবায়ন না করা এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো প্রকল্প চালু করতে না পারা বড় ব্যর্থতা। মনোরেলের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অতিবিনিয়োগে অল্প মানুষের সেবা দেওয়া একটি প্রহসন, সেটি প্রমাণ করার কিছু নেই। গণপরিবহনের দুরবস্থা নিয়ে এ শহর যেখানে ভারাক্রান্ত, সেখানে বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হঠাৎ নতুন বাহন যুক্ত করার ভাবনা শুধু উন্নয়ন দেখানোর প্রবণতা।’
মনোরেল কী
মনোরেল হলো এমন একটি রেলভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, যা প্রচলিত রেললাইনের মতো দুটি সমান্তরাল লাইনের ওপর নয়, বরং একটিমাত্র কংক্রিট বা ইস্পাতনির্মিত বিমের ওপর চলাচল করে। ‘মনো’ শব্দের অর্থ এক এবং ‘রেল’ অর্থ রেলপথ বা রেলপথে থাকা পাত। সেখান থেকেই এর নাম মনোরেল। সাধারণভাবে মনোরেলের দুটি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। একটি হলো ‘স্ট্র্যাডল-বিম’ পদ্ধতি, যেখানে ট্রেনটি কংক্রিটের বিমকে দুই পাশ থেকে চেপে ধরে তার ওপর দিয়ে চলে। অন্যটি ‘সাসপেন্ডেড’ পদ্ধতি, এতে ট্রেনটি বিমের নিচে ঝুলন্ত অবস্থায় চলাচল করে। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মনোরেল প্রকল্পে ‘স্ট্র্যাডল-বিম’ প্রযুক্তিই ব্যবহৃত হচ্ছে।
মনোরেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ উড়ালপথে নির্মাণ করা হয়। ফলে সড়কের জায়গা দখল কম হয়, যানজটের প্রভাব পড়ে না এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরে তুলনামূলক কম জমি অধিগ্রহণ করেই এটি নির্মাণ সম্ভব। এ ছাড়া এটি বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় শব্দ ও বায়ুদূষণ তুলনামূলক কম। তবে মনোরেলে রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও। এর যাত্রী বহনক্ষমতা সাধারণ মেট্রোরেলের তুলনায় কম। রুট সম্প্রসারণ ও ট্র্যাক পরিবর্তনও তুলনামূলক জটিল। বিশেষায়িত প্রযুক্তির কারণে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বেশি হতে পারে। এ কারণে সাধারণত শহরের ঘিঞ্জি বা বেশি ঘনবসতিপূর্ণ রুটে মনোরেল বেশি উপযোগী বলে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগর পরিবহনে মনোরেল ব্যবহৃত হচ্ছে। জাপান, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে এটি গণপরিবহনের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
কোন পথে মনোরেল
ডিটিসিএর নথি বলছে, বারিধারার যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথে নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মনোরেলের পথ তৈরির কাজ। সোজাসুজি গেলে এ পথের দূরত্ব হবে সর্বোচ্চ সাত কিলোমিটার। কিন্তু সম্ভাব্য পথটি নানা স্থান ঘুরে যাওয়ায় এর দূরত্ব হবে ২৫ কিলোমিটারের বেশি। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে বসুন্ধরা, ২৫ ইসিবি আর্মি ক্যাম্প, জলসিঁড়ি (সেক্টর-১১), পূর্বাচল সিবিডি, নামাপাড়া রোড, আশিয়ান সিটি, দক্ষিণখান, হাজী ক্যাম্প হয়ে প্রথম মনোরেলটি পৌঁছাবে বিমানবন্দর।
দ্বিতীয় মনোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ১৪.৬ কিলোমিটার। মধ্য বাড্ডা বাজার থেকে শুরু করে সাঁতারকুল, সান ভ্যালী আবাসন, কায়াতপাড়া, মুড়াপাড়া, মাজিপাড়া হয়ে যাবে ভুলতা পর্যন্ত। মনোরেলের তৃতীয় রুটটি হাজীপাড়া থেকে ডেমড়া পর্যন্ত ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটারের। হাজীপাড়ার পর দক্ষিণ বনশ্রী হয়ে নন্দীপাড়া, দক্ষিণগাও হয়ে ডেমড়া যাবে মনোরেল। বসিলা মোড় থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটারের পথটি মনোরেলের চার নম্বর রুট হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। ট্রেনটি বসিলা থেকে ছেড়ে রায়েরবাজার হয়ে হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর সেতু, বাবুবাজার সেতু হয়ে পোস্তাগোলা সেতু গিয়ে থামবে। পাঁচ নম্বর মনোরেলের রুটটি ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটারের। এটি জসীমউদদীন অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হয়ে উত্তরা সেন্টার, বিরুলিয়া সেতু, আকরাইন বাজার, রাজাশন হয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হবে।
মনোরেল নিয়ে সরকারের বর্তমান অবস্থান ও কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে আগামীর সময়কে জবাব দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তিনি বলছিলেন, ‘মনোরেল নিয়ে আরএইচডি (সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর) ও বুয়েট কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে কিছু রুট বাছাই করে সমীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ বোঝা যাবে কোন পথে মনোরেল করা যাবে, কোন পথে যাবে না। খরচ কেমন হবে বিস্তারিত তখনই বোঝা যাবে। তবে সব মিলিয়ে কাজ এগোচ্ছে, সরকার মনোরেল নিয়ে কাজ করছে।’
মেট্রোরেল লাইন-২ ও ৪ আলোচনার বাইরে: মেট্রোরেলের লাইন-২ ও লাইন-৪ সংক্রান্ত পরিকল্পনা কাগজে-কলমে থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এ দুটি লাইনের কথা যেন হারিয়েই গেছে। ফলে একসময় ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা এখন বাস্তবসম্মত নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সরকারকে চিঠি দিয়ে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জাপানের উদ্বেগের মূল কারণ দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্প ব্যয় ও বাস্তবায়ন সময় বাড়ছে।
সামগ্রিক বিষয়ে কথা হলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘মেট্রোরেল ও মনোরেল একে অন্যের বিকল্প নয়; বরং ভিন্ন সক্ষমতার দুটি ব্যবস্থা। মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় অনেক বেশি যাত্রী পরিবহন করতে পারে এবং নগর পরিবহনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে মনোরেল সাধারণত মাঝারি যাত্রীচাপের রুট, বিমানবন্দর সংযোগ বা ফিডার করিডরে (সংযোগ সড়কে) বেশি কার্যকর। ফলে মনোরেল প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে যদি মেট্রোরেল প্রকল্পের অর্থায়ন, জনবল বা প্রশাসনিক মনোযোগ কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর সমন্বিত গণপরিবহন পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরকারের জন্য পরীক্ষা হচ্ছে এখন মেট্রোরেলের ধীরগতির প্রকল্পগুলোকে দ্রুত গতিতে ফিরিয়ে আনা, একই সঙ্গে মনোরেলকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা যাতে সেটি মেট্রোরেলের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়।’

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews